অলীক পাতার অন্যান্য সংখ্যা- পড়তে হলে ক্লিক করুন Library ট্যাব টি



। । "অলীক পাতা শারদ সংখ্যা ১৪৩১ আসছে এই মহালয়াতে। । লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ১৫ ই আগস্ট রাত ১২ টা ।.."বিশদে জানতে ক্লিক করুন " Notice Board ট্যাব টিতে"

Sunday, January 9, 2022

গল্প-হিমশীতল জলে -তপন তরফদার

 

হিমশীতল জলে

তপন তরফদার

    

Image Courtesy: Google Image Gallery

মানুষ মরে যায় মাটিতে বা আগুনে পুড়ে বাতাসে মিলিয়ে যায়। অনেক জড় বস্তু চুপচাপ থাকলেও  মৃত হয়ে যায়না। কখন যে মাথা চাড়া দিয়ে উঠবে কেউ জানেনা। গল্পের যাদুকর আন্ত্যন চেখভ বলেন  প্রতিটি ধূলিকণার গল্পকথন আছে। পাড়ার ওই লাইটপোষ্টটা, বকুল গাছটা, হলুদ-কালো পাড়ার নেড়ি সারমেয়টির ও নিজস্ব কাহিনী আছে, গল্পকথন আছে। আবার গল্পে “টুইষ্ট”ও আছে। যারা জানার ঠিকই জেনে নেয়।তারা লাইটপোষ্টের সঙ্গে গল্পগুজব করে সময় কাটাবার সময় নেই। যারা পাগলামি করে সময় কাটায়, তারাই কালির আঁচড়ে ওদের মর্মকথা বা ব্যথায় ব্যথিত হয়। হিমঘর থেকে তুলে এনে অনুসন্ধান করে, সময়ের অপচয় করে কিনা তা সময়ই বলবে। 

 

        এই মনমর্জিয়া বৃদ্ধাশ্রমে বেশ কয়েক বছর কেয়ারটেকারের কাজ করে মুখ  দেখলেই বলে দিতে পারি, কি ছিলেন, কেন এখানে এসেছেন। ইদানীং কিন্তু  ওই সিনেমায় গল্পে যা দেখায়, বাড়ির লোকজন জঞ্জালের মতো এখানে ফেলে দিয়ে যায় তা কিন্তু সর্ব ক্ষেত্রে সত্যি নয়। ছায়া দস্তিদার নিজের উদ্যোগে ছেলের বিয়ে দিয়ে অষ্টমঙ্গলার দিনে নিজেই চলে আসেন মনমর্জিয়ায়। পুত্রবধু  কাকলি নিজে এসেছিল ফিরিয়ে নিয়ে যেতে। ছায়াদেবী ফিরে গেলেন না, উপরন্তু  বললেন, বৈদিক যুগে এই বয়সে বানপ্রস্থে যেতে হতো জীবনকে উপভোগ করতে। শিখা ঘোষ দে, কয়েক বছর হলো এখানে এসে সবার ভোল পাল্টে দিয়েছেন। শিখার রুপের বহ্নি শিখা এখনো জ্বালিয়ে দিতে পারে। কিছু মানুষ মানবদেহে কি যন্ত্রপাতি নিয়ে জন্মায়, যার কোনো ক্ষয় হয়না। শিখার শিখা এখনো দীপ্তিমান। বয়স এখানে একটি সংখ্যা মাত্র।

 

শিখাদেবী নিজেরা আনন্দে থাকবেন বলে ছোট-খাটো অনুষ্ঠান, পুজো-পার্বণ শুরু  করলেন। পুরুষ যতোই সিংহ হোক, ওই সুন্দরী ললনার কাছে নেংটি ইঁদুর। শিখার মুখ থেকে শুধু  নির্দেশ নির্গত হওয়ার অপেক্ষায়। ভাগ্যিস ওদের জীবন-সঙ্গিনীরা ধরাধাম ত্যাগ করেছেন, না হলে “মনমর্জিয়া”তে প্রতিদিনই কুরুক্ষেত্র হত। সিনিয়র সিটিজেনরা এখানে যে উদ্যমে উদ্যোগী হয়ে যা কাজ করে তা অনেক যুবা-পুরুষের কান কেটে নেবে।

শিখা দে সরস্বতী পুজোর উদ্যোগ নিয়েছেন। সাফল্যমন্ডিত হয়েছে।  স্কুলের একাদশ শ্রেণীর ছাত্র-ছাত্রীর মত সেজেগুজেই অঞ্জলি দিয়ে  পাত পেড়ে পংক্তি ভোজ খেয়েছে। সন্ধ্যায় ভালোবাসার দ্বৈতগান, দ্বৈতআবৃতি, নাটকের সংলাপে জমজমাট অনুষ্ঠান। বাঙালির ভ্যালেনটাইনসডে সরস্বতী পুজার দিন তা প্রমাণ করে দিল।

 

আক্ষেপের বিষয়  ছায়াদেবী যিনি নিজেই উদ্যোগী হয়ে আনন্দে বানপ্রস্থের জীবন কাটাবেন বলে এসেছেন তিনি কিন্তু নিজের ছায়াবৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসেননা।  মহাজাগতিক সূত্র অনুযায়ী এক আকাশে দুটো সূর্য থাকতে পারেনা। সেই জন্যই কি ছায়াদেবীর এই পদক্ষেপ। ঠিক বুঝতে পারিনি। বুঝলাম প্রতিমার নিরঞ্জনের পরে।

 

এই সময়ে গোধুলিরই দেখা মেলেনা। দুপুরের পরই ঝুপ করে প্রভাকর প্রভা বন্ধ করে দেয়। অন্ধকার করে দেয় ধরিত্রী। সরস্বতীকে ধুনুচি নাচ দেখিয়ে ভাসান দেওয়া হবে। নাচ চলছে তো চলছেই। এত এনার্জি, এত প্রোটিন কোথা থেকে আসছে কে জানে। রাত হলেও অসুবিধা হবেনা। বৃদ্ধাশ্রমেই সুসজ্জিত পুকুর আছে। আবাসিকরা বাতায়ন থেকেই দিঘির সৌন্দর্যের স্বাদ ফুলের ঘ্রাণ, গ্রহণ করে। কনকনে শীতের রাত।প্রতিমা নিয়ে পুকুরে আমাকেই নামতে হবে।

 

প্রদীপ্ত হাজরা পাইলট ছিলেন। সবসময় বিদেশের গল্পগুজবে খই ফুটান। অনেক জানে, অনেক খেয়েছে, অনেক কিছু  করেছে, ভাগ্যের পরিহাস না এটাই নিয়তি যার জন্য এখানে থাকতে হচ্ছে। উনি কথার কলাকৌশলে সুন্দর উপস্থাপনা করেন। সবাই  শোনে। হাজরা স্যার বলতে শুরু  করলেন – “হিমাহিত জলে  জাপানে এক বিরাট উৎসব হয়। যার নাম হাদাকা মাতসুরি বা নগ্ন পুরুষদের উৎসব। স্রেফ একফালি ন্যাকড়ায় যতটুকু না হলে নয়, ততটুকুই লজ্জা নিবারণ করে হাজারো জাপানি পুরুষ এদিন হাড় কাঁপানো  ঠাণ্ডা জলে নামেন। পশ্চিম জাপানের ওকায়ামার সাইদাইজি মন্দিরে হয় এই উৎসব। হাজরা স্যারের গলায়  যাদু আছে। সবাই সন্মোহিত। চোখ বড়োবড়ো করে বলেন মজার কথা কি জানেন?  শিখারানী বলেন, বলুন বেশি রহস্য করবেন না। হাজরা স্যার শুরু করলেন, পুরোহিতের ছোঁড়া লাঠি পাকড়াতে ছোট্ট জলাশয়ের মধ্যে অসংখ্য লোকের হুড়োহুড়ি।

 

এই উৎসব অন্তত ৫০০ বছরের পুরনো। হাজারদশেক মানুষ ধর্মীয় এই অনুষ্ঠান পালন করেন কনকনে হিম জলে স্নান করে। তবে বিষয়টা স্রেফ বরফ জলে স্নান করা নয়। আহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে ষোল আনা। তাই পরনের ন্যাকড়ায় নিজের রক্তের গ্রুপ লিখে জলে লাফাতে হয়। আচমকা আহত হলে যেন  রক্ত নিয়ে গন্ডোগোল হয়না। হাদাকা মাতসুরিতে যোগ দিয়ে পুরো অক্ষত শরীরে বেরিয়ে আসা অসম্ভব। ঠেলাঠেলিতে কপাল ফুলে যাওয়া, হাত পা ছড়ে যাওয়া তো সামান্য ঘটনা। পদপিষ্ট হয়ে মৃত্যুও হয়েছে বহু। কিন্তু দেড় ইঞ্চি ব্যাস আর আট ইঞ্চি লম্বা ওই পবিত্র লাঠিকে কব্জা করতে প্রাণসংশয় হলেও পিছপা নন জাপানিরা। তাঁদের বিশ্বাস, পুরোহিতের ছুঁড়ে দেওয়া ওই লাঠি যে পাকড়াও করবে, তার ভাগ্য খুলে যাবে। অতএব? হাজারদশেক মানুষ জলে ঝাঁপান। আচমকা নিভে যায় আলো, মন্দিরের ওপর থেকে পুরোহিতরা শুরু করেন রহস্যময় মন্ত্রপাঠ। ওপর থেকে ঢেলে দেওয়া হয় হিমশীতল পবিত্র জল আর লাঠি। ভিড়ের চোটে শ্বাসরোধ হয়ে আসা স্বাভাবিক। আকাশ থেকে ছিটকে পড়া লাঠি ধরতে অন্ধকারেই লাফিয়ে ওঠেন অসংখ্য প্রায় নগ্ন মানুষ। শুরু হয় হুড়োহুড়ি। হাতে পেয়েই নিস্তার নেই, একসঙ্গে যুঝতে হবে অসংখ্য প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে, সৌভাগ্যের আশায় সবাই চেষ্টা করছেন লাঠিটি কেড়ে নেওয়ার।প্রাচীন জাপানিরা বিশ্বাস করতেন, যে ওই লাঠি শেষ পর্যন্ত নিজের সঙ্গে রাখতে পারবেন, তাঁর ক্ষেত শস্যে ভরে যাবে। যন্ত্রণা ভুলতে অনেকে নেশা করে যোগ দিতে আসতেন উৎসবে। এখন অবশ্য নেশা  কঠোরভাবে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন আর আগের মত শস্যের সম্ভাবনা নিয়ে মানুষ উৎসাহী নন। এবারেই এক যুবক হাতে লাঠি পেয়ে  একগাল হেসে  বলেছেন, ঈশ্বর উপহার পাঠিয়েছেন, এবার নিশ্চয়ই গোলগাল, সুস্থসবল বাচ্চা হবে। ছায়াদেবী কখন ছায়ার মায়ায় মিলিয়ে গেছেন লক্ষ করিনি।

 

শান্তির জল ছিটাবার জন্য মঙ্গলঘটে জল ভরে শিখাদেবীকে দিয়ে, আমি সাঁতার কাটতে থাকি। আবাসিকদের এবার শীত লাগছিল, যে যার ডেরায় ঢুকে পড়েছে। ছায়াদেবী জানলা দিয়ে আমাকে চিৎকার করে বলছেন ঠান্ডায় জলে কেন। উঠে পড়ুন অসুখ হবে। ওনার হাড়হিম আর্তনাদে বুঝতে পারলাম এই ঠান্ডা জলের কোনো ইতিহাস আছে। আমাকে জানতেই হবে, দেরি করলে এই মানসিক অবস্থান পাল্টে যাবে। আমি সিধে উনার ঘরে ঢুকে নাড়ুগোপালের মূর্তি  ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করলাম, কাউকে বলবোনা। আপনি আমাকে বলে মন হালকা করুণ। উনি কিছুতেই বলবেননা। আমিও নাছোড়বান্দা। মুখ খুললেন।

 

“তখন ক্লাস টুয়েলভে পড়ি। আমাদের স্কুলে সরস্বতী ঠাকুর দেখতে এসে অর্নিবান আমাকে ইশারায় বুঝিয়ে দেয় আমার সঙ্গে প্রেম করবে। আমার খুব রাগ হয়। শুনেছিলাম কোনো এক সিনেমায় নায়িকা তার প্রেমার্থীকে বলেছিল, শীতের রাতে সারারাত পুকুরের ঠান্ডা জলে ডুবে থাকলে প্রেমিকা হবে। আমরা থাকতাম বালি দুর্গাপুরের সমবায় পল্লীতে। পল্লীর মাঝখানে ডিম্বাকৃতি এক ঝিল। ঝিলের চারধারে বসতি। অনেক ঘাট, অনেক বাড়ির নিজস্ব ঘাট আছে। সরস্বতী পুজো ওই ঝিলের জলের উপর হয়। লাইট দিয়ে সাজানো হয়। সে এক অপরুপ দৃশ্য। হরিদ্বারের হর কি পৌড়ির থেকেও সুন্দর। মজা করে অর্নিবানকে ফিশফিশ করে বলি সারারাত আমাদের ঘাটের সরস্বতী ঠাকুরের কাছে ডুবে থাকলে আমাকে পাবে।

রাত একটা,আমি জানলা দিয়ে তাকিয়ে ভয় পেয়ে যাই। ইশারায় বলতে থাকি উঠে যাও, বাড়ি যাও। মা বলে এত রাতে জানলায় কেন, শুয়ে পড়। পরদিন শুনতে পাই অর্নিবানের নিউনিমোয়া হয়েছে। ব্যান্ড বাজিয়ে বিসর্জনে বেরুবে। খবর আসলো অর্নিবান মারা গেছে। কাউকেই কিছু  বলতে পারিনি, সারাজীবন চুপচাপ হয়ে  গুমরে মরেছি, আমি প্রেমের লোভ দেখিয়ে হিমায়িত করে খুন করেছি।

ফিরুন সূচিপত্রে



| হিম সংখ্যা-১৪২৮| aleekpata.com|
  |ALEEK PATA- Your Expressive World |Online Magazine |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty|
 Winter , 2021 | August -December 2021 | Fifth Year  Second  Issue |28 th Edition|
|© All Rights Reserved By The Editor and The Publisher |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |


Saturday, January 8, 2022

গল্প-কাউন্সেলিং- শম্পা বণিক

 

কাউন্সেলিং

শম্পা বণিক

Image Courtesy: Google Image Gallery
 

আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে প্রায়ই আজকাল নিজের সাথে বিরোধ বাধে পারমিতার। জীবনের হিসেবে এত গরমিল মনে হয় কেন তার। বিদ্ধস্ত লাগে। তবে কি তার জীবন দৃষ্টিতে গোড়াতেই ভুল ছিল? অন্যায় ? না বোকামি? আজকাল এমনই প্রশ্ন ঝড়ে আলগা হতে চায় পারমিতার আত্মবিশ্বাসের ভিত । আসলে সে যে সময়ের সাথে চলতে না পারা একজন মানুষ, এটা প্রতি পদক্ষেপে বুঝতে পারে। পৃথিবীর নিরন্তর বেড়ে চলা গতিবেগে ক্লান্ত মনে হয়। “ক্লান্তি আমার ক্ষমা কর প্রভু”, এই আকুতি মনজুড়ে। কিন্তু ক্ষমাহীন সংসার উপহাস প্রিয়। উপেক্ষা অসম্মানের সদ্ব্যবহার করেই তৃপ্ত। প্রায় মধ্য পঞ্চাশে এসে এই উপলব্ধি অবসাদ আনে। পারমিতা উত্তর খোঁজে। আগে কিন্তু এসব কথা কোনদিন ভাবেনি সে। নিজেকে বেশ বুদ্ধিমতী মনে হ’ত। সংসারে নিজের গুরুত্ব সম্পর্কে অতিবোধ তাকে তাড়া করে ফিরেছে চিরটাকাল । সবাইকে নিয়ে চলা যায় না এই সত্য বুঝতে বুঝতে পার হয়ে গেছে অনেক মূল্যবান সময়। পান থেকে চুন খসলে সেই মানুষগুলোর আচরণ অচেনা মনে হয়, আঘাত লাগে। তবে পারমিতা পাথেয় সংগ্রহ করতে ব্যর্থ হলেও সূক্ষ দায়িত্ব পালন আর কর্তব্য বোধ সবসময় তাকে মানসিক তৃপ্তি দিয়েছে শান্তি দিয়েছে। যার কোন তুলনা হয় না। সেই শান্তিগুলো একান্তই তার নিজস্ব সম্পদ। তার মূল্যবোধ তার দুর্বলতা, বোকামি না। একথা জনে জনে বোঝানোর দায় তো তার নয়। সেদিন ছেলে যখন বলল,

_ মা নিজেকে অত গুরুত্বপূর্ণ ভেবো না। যে যা ভালো বোঝে করুক। তোমার কথা তো শুনবে না। নিজে তারপর কেঁদেকেটে প্রেসার বাড়াবে। ওর বাবা বলে,

_পারিস তো বোঝা। আমি তো বলে বলে হাল ছেড়ে দিয়েছি। যেচে অপমানিত হয় প্রতিবার।

 

কী করে বোঝাবে সে এ বয়সে নিজেকে বদলানো যায় না। ভিতরের শিক্ষাকে অস্বীকার করা যায় না। মানবতার সংজ্ঞা প্রতিদিন পাল্টে যাচ্ছে একথা সত্য ,তবু কিছু মানুষ উষালগ্নের মূল্যবোধ কিছুতেই ত্যাগ করতে পারে না । মনে হতেই পারে নির্বোধের অলংকার। বৌমা বোঝায়,

_ তুমি এত ভেবো না মাম্মি। সবাই নিজের ভালো বোঝে। তুমি কাউকে ভালোর জন্য বলতে যাবে সে ভাববে জ্ঞান দিচ্ছ। আর একবার যদি ধরে নেয় তুমি জ্ঞান দিচ্ছ। সে তোমাকে যে ভাবেই হোক অপমান করবে। যুগটাই এমন। আমি জানি বলেই বলছি।

 

পারমিতা বোঝে। বহুবার তার বিশ্বাস ভেঙ্গে চুরমার হয়েছে। আবার জোড়া লাগিয়ে বারবার বেলতলায় যাওয়াটাই তার স্বভাব।

পারমিতার একাকীত্ব সাধ করে বরণ করা। বা ওর অক্ষমতা । সমাজ আমাদের মিলিটারী ক্যাম্প নয় তা বলে নৈতিক চরিত্র এত নেমে যাবে কেন ! হয়তো এই অধঃপতন শুরু হয়েছে অনেক আগেই এখন তার খোলামেলা নির্লজ্জ আত্মপ্রকাশ। মনে কর- একজন বাবা বা মা তাদের সদ্য হাঁটতে শেখা বাচ্চাটার হাত ধরে রাস্তায় হাঁটছে। রাস্তা থেকে ওই শিশুর নাকে উচ্চতা কতটুকু! পারমিতা এগিয়ে গিয়ে বলল,

_ ওকে কোলে নাও । কত দূষিত হাওয়া ওর নাকে ঢুকছে।

_ আপনার কি? খেয়েদেয়ে কি কাজ নেই?

বলা বাহুল্য এখনকার নতুন অভিভাবকরা পারমিতার ছেলের বয়সি। এখন বাড়িতেই বড়রা কিছু বলতে গেলে ছোটদের স্বাধীনতায় হাত পড়ে, আর তো বাইরের লোক। সংবেদনশীল মানুষের অপমান বোধ তীব্র। তবু সে বলে কারণ বাচ্চাটার আসন্ন অসুস্থতা তাকে ভাবায়। সে উদাসীন হতে পারে না। ছেলে বলল,

_ কেন বলতে যাও?

_ কিন্তু বাচ্চাটার কি দোষ বল?

_ তোমার বাচ্চা? ফালতু কথা শুনতে ভালো লাগে ?

 

পারমিতার ছেলে বুবাই তখন ক্লাস টু কি থ্রি তে পড়ে। খুব রোগা ছিল। স্কুলবাসের জন্য দাঁড়িয়ে মায়ের সাথে। সামনের চায়ের দোকানের বয়স্ক ভদ্রলোক দোকানী  এগিয়ে এসে বলল,

_ রোজই একটা কথা বলব মনে করি। খদ্দের এসে যায়।

_ বলুন কি বলবেন?

_ একটা কাঁচের শিশিতে খাটি মধু নিয়ে তার মধ্যে কিছু গোলমরিচ ফেলে রাখবে। কিছুদিন পর থেকে রোজ সকলে ছেলেকে খালি পেটে খাইও। ওর চেহারা ফিরবে। বড্ড রোগা।

_ ঠিক আছে।

 

অভিজ্ঞতাকে সেতো ছোট করতে পারেনি। মনে আছে মধু খেয়ে ছেলের চেহারা না ফিরলেও চট করে ঠান্ডা লাগতো না। পারমিতার কাছে সময়টা অনেক সহজ ছিল।

কেউ হয়ত জরুরি ভিত্তিতে কোন ডাক্তারের ফোন নম্বর চেয়ে নিল। পারমিতা দিল। পরে শুনল ওই ডাক্তারের ব্যবহার খারাপ। ভিজিট বেশি । অকারণে টেস্ট করায়। এই হল রিটার্ন গিফট। এতে ওর দোষ টা কোথায়!

 

আজও এমন ঘটনা ঘটে। তবে এখন ওর কাছে অনেককিছুই প্রত্যাশিত। কয়েকবছর আগের কথা, পাড়ার এক শয্যাশায়ী বৃদ্ধা মাসিমাকে দেখতে গিয়ে ওনার ছেলের বউটাকে বলল,

_ মাসিমার হাতে পায়ে একটু বোরোলিন লাগিয়ে দিতে বলো আয়াকে।

পাশের ঘর থেকে ছেলে বেরিয়ে এসে বলল,

_ মাকে ভাবছি এবার পার্লারে নিয়ে যাব। সারা পাড়ায় মায়ের এত হিতাকাঙ্খী জানা ছিল না।

পারমিতা আর কথা বলতে পারেনি। জীবন্মৃত মানুষটার গায়ে একবার হাত বুলিয়ে চলে এসেছিল।

পারমিতার মনে হয় অথর্ব মানুষদের অবসর ভাতার আইন পরিবর্তন দরকার। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এর অপব্যবহার হয়। ওর বর বলল,

_ ঠিক হয়েছে। বলতে গেছে কেন, ওদের মা ওরা বুঝবে।

_ যা বুঝছে দেখে এলাম তো।

 

পারমিতার মায়ের শিক্ষা ছিল ডাক্তারবাবুদের ঠিকানা সবসময় হাতের কাছে রাখবে। তাই ওর মোবাইলে অনেক ডাক্তারের নম্বর সেভ করা। একবার কোন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আলাপ হয়েছিল তারই সমবয়সী হবে একজন মহিলার সাথে। শাশুড়ি মা কে নিয়ে এসেছে তলপেটের ইউ.এস.জি করাতে। সত্তরোর্ধ বৃদ্ধা। খুব ব্লিডিং হচ্ছিল। বৃদ্ধার ছেলে কাপড়ের দোকানে কাজ করে। ছুটি পায়নি। ছেলের বউটা মনমরা হয়ে বসে। জানে না এরপর কি করবে কাকে দেখাবে। ডাক্তার সন্দেহ করছে জরায়ু ক্যান্সার। পারমিতা ওকে স্ত্রীরোগ বিশেষজ্ঞ আর  অঙ্কোলজিস্ট এর নম্বর দিয়ে বলল,  এনাদের সাথে দেখা করবেন । আপনার অসুবিধা হবে না । নিজের মায়ের ক্যান্সার ধরা পড়ার পর থেকে এই নম্বরগুলো ওর কাছে সেভ করা। সাধারণ অসুখ বিসুখ করলে সহজেই কোন ডাক্তার দেখিয়ে নিই আমরা। কিন্তু এইসব অসুখ দিশেহারা হয়ে পড়ে মানুষ। পারমিতার সে অভিজ্ঞতা আছে। ভদ্রমহিলা ওর দুহাত ধরে কেঁদে পড়েছিল। পারমিতা ভাবে এটুকু তো করা যেতেই পারে। বিনিময়ে মন যে শান্তি টুকু পায়, তা দুর্লভ। এ তার মনের পরম পাওয়া প্রতিক্রিয়া যাই ই হোক। একবার প্রায় মধ্যরাতে এক আত্মীয়ের ফোন এল,

_ বৌদি, বাবাকে এক্ষুনি কোথাও ভর্তি করতে হবে। কথা জড়িয়ে গেছে । মনে হয় স্ট্রোক।

ভদ্রলোককে সেই রাতেই ভর্তি করা হল, কাছেরি এক নার্সিংহোমে । সে যাত্রায় মানুষটা বেঁচে ফিরলো । এবার পারমিতার রিটার্ন গিফট ,

_বৌদি। আর কদিন বাবাকে রাখতে হলে আমাদের তো পথে বসতে হোত। নার্সিংহোম না কসাইখানা! যাই হোক অনেক ধন্যবাদ আপনাকে। কৈ এর তেলেই কিন্তু কৈ ভেজেছে। অথচ হাবভাব দেখলে মাথা গরম হয়ে যায়।

কথায় আছে স্বভাব যায় না ম'লেও। উপকারের গুঁতো কখনো দ্বিগুণ হয়ে ফিরে আসে। যার ফল ভোগ করতে হয় বর কে ছেলে কে। আজকাল সে অনেক মেপে মেপে চলে। ঘর সংসার আত্মীয় বন্ধু এই নিয়েই তো জীবন বয়ে চলে। অসুস্থ মনে হয় নিজেকে পারমিতার। অসুখ যেন তার রক্তসংবহণে।

কিন্তু ও এমন কেন খুঁজতে গেলে পিছিয়ে যেতে হবে অনেকগুলো বছর। একটা আট দশ বছরের মেয়ের উপর ভার তার ছোট ছোট ভাইবোনের। মা অসুস্থ তাই । সেই মেয়ে দিদি নয় মায়ের মতো করে আগলে রাখত। দায়িত্ববোধের জন্ম সেই থেকে। যতদিন গেছে তা আরও বেড়েছে। স্বভাব বা অভ্যাস বশতঃ  শ্বশুরবাড়িতেও প্রথম থেকেই দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে জড়িয়ে পড়েছে। সময়ের স্পর্শে সবাই আজ নিজের নিজের মতো সাজিয়েছে জীবন। পারমিতার প্রয়োজন ফুরিয়েছে কালের নিয়ম মেনে। কিন্তু কষ্ট সেখানে কেউ আঙুল তুললে অন্য কেউ বলে না,

_দিদিতো এমন নয়। বা,

_বৌদি একথা বলতেই পারে না। বা,

_পারমিতা এ কাজ করতে পারে না

উল্টে আঙুল গুলো দলবদ্ধ হয় জীবনের উৎসবে। পারমিতাই দোষী। সময় কোথায় যেন থেমে আছে তার।

পারিবারিক ডাক্তারবাবু ওর বরকে বলল,

_ কোথাও ঘুরে আসুন। ভালো কাউকে দিয়ে কাউন্সেলিং করানো দরকার। আমি ওষুধ দেবো না। তাতে উনি স্লো হয়ে যাবেন। উনি যে লেখালেখি করেন সেটা বন্ধ হয়ে যাবে।

পারমিতার কিছু ভালো লাগে না। সবসময় দোলাচল মনের মধ্যে। ঠিক হল হাওয়া বদল করতে যাওয়া হবে দক্ষিণভারত । পারমিতার প্রিয় গন্তব্য । প্রায় কুড়ি বাইশ দিন বেড়ানো শেষে এবার বাড়ি ফেরা। যশোবন্তপুর স্টেশন । দুরন্ত দেয়নি এখনও। পারমিতারা চারজন ওয়েটিং রুমে বসে। বছর পাঁচেকের ছোট্ট মেয়েটি ছুটে বেড়াচ্ছে। ওর মা বসে পারমিতার পাশে। বাবাটা একটু দূরে দাঁড়িয়ে কারো সাথে কথা বলছে। ওরাও দুরন্ত এক্সপ্রেস ধরবে। ওদের বাড়ি শিলিগুড়িতে। ব্যাঙ্গালোরে এসেছে ট্রিটমেন্ট করতে। ভদ্রলোকের ব্রেন টিউমার অপারেশন হয়েছে। ডাক্তার বলেছে রেডিওথেরাপি করতে হবে । একমাস হোটেলে থেকে টাকাপয়সা শেষ। ভদ্রলোকের দিদি থাকে ব্যান্ডেলে। এখন সেখানেই উঠবে। তারপর কোথায় কিভাবে পরের চিকিৎসা হবে পুরোটাই অনিশ্চিত। তবে ডাক্তার বলে দিয়েছেন যত তাড়াতাড়ি সম্ভব রেডিয়েশন শুরু করে দিতে । পারমিতার বৌমা পাশেই বসে শুনছিল ভদ্রমহিলার কথাগুলো। বলল ,

_আপনাদের কত নম্বর কম্পার্টমেন্ট?

_ বি২

_আমাদেরও । ট্রেনে উঠে কথা হবে।

 

দুরন্ত তে ওঠা মাত্র এটা সেটা খাবার দেওয়া শুরু হয়ে যায়। লাঞ্চের পর পারমিতা জানালায় বসে বাইরে তাকিয়ে। কিছুটা আনমনা। বৌমার ডাকে ঘুরে তাকাল। সাথে ওই ওয়েটিং রুমের ভদ্রমহিলা-

_ মাম্মি আমি বলেছি তুমি নিশ্চয়ই হেল্প করবে।পারমিতা তাকিয়ে বৌমার দিকে।

_ বলে দাও কোলকাতায় গিয়ে কোথায় কিভাবে কি করতে হবে।

পারমিতা যেন জানালায় বসে এ কথাই ভাবছিল। তখনই প্রয়োজনীয় ঠিকানা ফোন নম্বর দিয়ে কিভাবে যেতে হবে সব বুঝিয়ে দিল। মনটা অনেক হালকা লাগছে। সন্ধ্যার দিকে ভদ্রলোক ভদ্রমহিলা দুজনেই এল । বলল

_ ডাক্তারের সাথে কথা হয়েছে। আগামী পরশু থেকেই রেডিওথেরাপি শুরু করা যাবে। কেস হিস্ট্রি ফোনে যতটা সম্ভব বলেছি। বললেন কোন ভয় নেই । দিদি কাল গিয়ে টাকা জমা দিয়ে আসবে । ধন্যবাদ না অন্তরের কৃতজ্ঞতা রেখে গেলাম।

 

ওরা চলে গেলে পারমিতা আবার জানলায় চোখ রেখে বসে রইল । সে যেন অনেক দূর থেকে বাড়ি ফিরছে আজ। মনে আসছে কান্ত কবির লেখা প্রিয় লাইন-

"প্রভু, বিশ্ব -বিপদহন্তা ,

তুমি দাঁড়াও ,রুধিয়া পন্থা ;

তব, শ্রী চরণ তলে নিয়ে এস, মোর

মত-বাসনা গুছায়ে !

মলিন মর্ম মুছায়ে"

ফিরুন সূচিপত্রে



| হিম সংখ্যা-১৪২৮| aleekpata.com|
  |ALEEK PATA- Your Expressive World |Online Magazine |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty|
 Winter , 2021 | August -December 2021 | Fifth Year  Second  Issue |28 th Edition|
|© All Rights Reserved By The Editor and The Publisher |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |

গল্প-না ইয়ে সচ না বো সচ - অলভ্য ঘোষ

 

না ইয়ে সচ না বো সচ

অলভ্য ঘোষ

Image Courtesy: Google Image Gallery
 

স্থানীয় কাউন্সিলর গোপাল ঘোষ কে ধরেকরে চার নম্বর লকগেটের খাল পাড়ে বাঁকা ব্রিজটা ওঠার ঠিক মুখে। বটতলায় ওপরটা প্লাস্টিকের ছাউনি টাঙ্গিয়ে একপাশে দরমা বেড়া দিয়ে সুরেন নাপিত ভাগলপুর  থেকে কলকাতা আসার পাঁচ বছরের মাথায় নিজের একটি সেলুন খুলেছিল। তারপর বিয়ে করল এখানকারই মেয়ে, বাপ রিকশা চালায়। সুরেন নেশা ভাং করে না হাতের কাজ শিখেছে চুল কাটতে জানে। তার খাওয়া পরার অভাব হবে না। সত্যি সেলুনটা গাছতলায় হলেও বেশ চলছিল ভালো।

 

পাকা দোকান আয়না, ক্রিম স্নো, পাউডার, ম্যাসাজ, ফ্যানের হাওয়া। চকচকে ঝকঝকে সেলুনের থেকে সুরেনের সেলুনে চুল কাটতে লাগে মাত্র কুড়ি টাকা। ফলে এই মাগ্যিগণ্ডার বাজারে কেবল মুটে মজুররাই নয়,  অনেক অফিস বাবুরাও টুক করে বটতলায় বাজার করে ফেরার পথে সুরেনকে দিয়ে দাড়ি কামিয়ে নেয়। চুল কাটায়। বগল চাঁচায়। এর উপর রয়েছে অন্নপ্রাশন, বিয়ে ও শ্রাদ্ধ বাড়ির কাজ। সেখানেও ভালো রোজগার খাওয়া দাওয়া। মোটের ওপর এ তল্লাটে সেলুন না থাকায় সুরেনের ব্যবসা টা চলছিল ভালোই। বৌ দুই এক বাড়ি খাওয়া পরার কাজ করে। ফলে সংসারে অভাব বলতে কিছুই ছিলনা। ছেলেটা আসার পর; সুরেন দেখল সংসারে পেট বেড়েছে। নতুন ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলার মত করে সুরেন সেলুনের গায়ে বটতলার নিচে স্থাপন করে শিবলিঙ্গ।প্র তি সোমবারে পাড়ার লোক পুজো দেবে। শ্রাবণ মাসে জল ঢালবে মেয়ে-বৌরা। বেলটা, কলাটা, কাঁঠালটা, শসাটা, শাঁকালুটা, ডাবের জলটা, নারকেলটা প্রসাদ হিসাবে পাবে। প্রণামি বাক্সে জমবে টাকা। পাশে যদি আরও একটা শনি ঠাকুরের মন্দির খোলা যায় তখন আর পায় কে সুরেন কে। এতে আর একটা ব্যাপারে নিশ্চিন্ত হতে পারবে সুরেন। তার আশেপাশে প্রতিদ্বন্দ্বী কেউ গজাবে না। তার দোকানে এক পাশে ময়লা ফেলার ঢিপি আর এক পাশে বটতলা। ময়লা ফেলার ঢিপিতে তো কেউ দোকান খুলবে না। রইল বাকি গাছতলা। তা গাছ তলা ফাঁকা থাকলে কেউ না কেউ বসবে পান বিড়ি সিগারেট নিয়ে। সে স্থানে ঠাকুর দেবতা বসিয়ে দিলে আর কারো বাবার সাধ্য নেই বসার। অনেকটা ভদ্রলোকের বাড়ির দেওয়ালে ঠাকুর দেবতার ছবি টাঙ্গানোর মত ঘটনা। পাবলিকের হিসু মাথায় উঠে যায়। দেওয়ালে মোতা বন্ধ। এসব কথা মনে পড়লেই সুরেন মুচকি হাসে। সবই তোমার মহিমা ভগবান। তুমি কার কে চাকরি দাও আবার কারো বা চাকরি খাও। বটতলায় তলায় রাস্তার মোড়ে মোড়ে যত শনি মন্দির শিব মন্দির মনসা মন্দির শীতলা মন্দির পার্টি অফিস দখল জমিতে ক্লাব রয়েছে; এগুলো তুলে দিলে কত বেকারের কর্মসংস্থানের পথ হত সুরেন জানে। তবুও না জানার ভান করে। ভগবান মাথায় থাক। থাক বাবা আমার শনির দোষটা কাটিয়ে দাও। দখলে রাখো আমার সুরক্ষা আমার দুধ ভাত।

 

- ভগবান এক দরবান হ্যায় বেটা, সিকিউরিটি গার্ড। তুমহারা সব-কুছ দেখভাল করতা হ্যায়।

 

সুরেনের কপাল খুলেছে ফকির চাঁদ বাবা এখানে আসার পর থেকে। মন্দিরটা শুরু করেছিল মাইক টাইক বাজিয়ে গান বাজনা প্যান্ডেল ট্যান্ডেল বেশ জমজমাট পূজাআর্চা করে। কিন্তু মন্দির ব্যবসা ঠিক জমছিল না সুরেনের। সেই সময় কোথা থেকে এসে জুটল ফকির চাঁদ বাবা। বাবাজি হাত দেখতে পারে। হাত দেখে সুরেন কে বলল, -বেটা তু তো রাজা হ্যায়।

সুরেন মুখ বেজার করে বলেছিল, -মহারাজ দো রোজ কি খানা পীনা তো মিল জাতা হ্যায়; লেকিন ...

ফকির চাঁদ বাবা বলেছিল, -সোচ মত বেটা। এক রোজ তুম দুনিয়া কো খিলাওগে।

-ক্যা খিলায়ংগে?

-গুল খিলায়ংগে।

শেষ দুটো কথা ফকির চাঁদ বাবার সাথে না হলেও সুরেনের  মনে হয়েছিল। যদি চা বেচতে বেচতে নরেন্দ্র মোদী দেশের প্রধানমন্ত্রী হয়ে যেতে পারেন। সুরেনো বা কেনও চুল কাটতে কাটতে একদিন কেউকেটা কিছু একটা হতে পারবে না। সুরেনের ফকিরচাঁদ বাবার কথাগুলো বেশ ভালো লেগেছিল। লোকটা বেশ কাজের। বাবার ছাওয়ায় যদি ভাগ্য চমকায় ক্ষতি কি। ওই গাছ তলায় বাবার বসার একটি আসনও করেছিল সুরেন। ফলে বাবাকে হাত দেখাতে লোকের ভিড় জমতে লাগল। মন্দিরেরও পসার জমল। আর সত্যিই সুরেনের রোজগার বাড়ছিল লাফিয়ে লাফিয়ে। একটি ব্যাংকের খাতাও খুলেছিল। জিরো ব্যালেন্সে সেই অ্যাকাউন্টেও বেশ জমছিল টাকা পয়সা।

 

কিন্তু সে সব অতীত। আজ ছয় মাস সুরেনের কাজ নেই। বৌটার জ্বর কাশি। ডাক্তার বাবুরা তুলে নিয়ে গেছে হাসপাতালে। এই বস্তির ঘরে কোয়ারেন্টাইন না ফোয়ারেন্টাইন সে সব সম্ভব নয়। ঘাড়ে ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। সেনেটারী পায়খানায় সকলে থেবড়ে বসে হাগা মোতা। তাই কারো করোনা হলে ধাপার মাঠ। একমাত্র আস্তানা সরকারি হাসপাতাল যাও সেখানে পাছা উল্টে থাকো। জনসাধারণের ক্ষতি করে বস্তিতে থাকা চলবে না। বস্তির লোক কিছুতেই থাকতে দেবে না। ব্যাঙ্কে যে দুটো পয়সা জমেছিল তাও ভাঙ্গিয়ে ভাঙ্গিয়ে খেতে খেতে ফুরতে শুরু করেছে।

 

সুরেনের চুল কাটার টেবিলে একটা মেয়ে মানুষ। উথলানো বুক। ব্লাউজের গোল ফাঁক পাখির চোখে সুরেন সে দিকে চাইতেই হাত থেকে কাঁচিটা পড়ে বুকের লম্বা চেরাই করা খাঁচায় কাঁচির ছুঁচলো দিকটা যেন তির গেঁথে যাবার মত আটকে গেলো। কাঁচির সুড়সুড়িতে মেয়ে মানুষ টার যেন কুড়-কুড়ানি জেগে উঠল। সে খিলখিল করে উঠলো হেসে। কিন্তু মেয়ে মানুষের চুল সুরেন তো কাটে না।

 

দোকানের পাশ থেকে জোরে সাইকেল চালিয়ে বেরিয়ে গেল কমল দা। সুরেন রেলিংয়ের দিকে তাকাল। রেলিং ফাঁকা। এই তো স্নান করে লুঙ্গিটা ওখানে মেলেছিল সুরেন। সাইকেল চড়ে চলে যাওয়া খালি গা মোটা চেহারার কমলদার পরনে সুরেন দেখতে পেল নিজের লুঙ্গিটা।

 

সুরেন যেন মনে মনে বলল, - যা ঝেড়ে দিল।

সুরেন এর সামনের মেয়ে মানুষ টা যেন আরও কুড় কুড়িয়ে হেসে উঠলো।

-অভাব ... অভাব একেই বলে বুঝলে।

সুরেন রাস্তার দিক থেকে মেয়ে মানুষটার দিকে চেয়ে  চেঁচিয়ে ওঠে।

-অভাব না স্বভাব শালা চোর চোটটা চিটিংবাজ।

আর ঠিক সেই সময় তার দিকে সারি সারি জীর্ণ হাত এগিয়ে আসতে থাকে। লেংটা পেট উঁচু চোখ গুলো ঠেলে বেরিয়ে আসতে চাইছে। নাক থেকে শিকনি ঝরে পড়া বাচ্চা গুলো। ভিখারির মত বাটি মেলে রয়েছে তার দিকে।

- ফ্যান দাও একটু ফ্যান দাও......

মাগিটা আরও হাঁসতে লাগল; হ...ও... হ...ও করে...

আর ঠিক সেই সময় সুরেনের মুখের সামনে ভেসে উঠলো বড় বড় দাড়ি গোঁফ সম্বলিত ফকির চাঁদ বাবাজির মুখ টা।

- মহামারী মন্বন্তর।

 

সুরেন যেন পৌঁছে যায় ছিয়াত্তরের মন্বন্তরে। কলকাতার রাস্তায় সারি সারি পড়ে রয়েছে ক্ষুধার্ত মানুষের মৃতদেহ। আয়নার কাঁচে সুরেন তখনো তার চুলকাটার চেয়ারে বসে থাকা মেয়ে মানুষ টার মুখ দেখতে পায়নি। দুধ দুটো দেখেছে। কাপড় ফুঁড়ে বের হয়ে আসতে চাওয়া দুটো দুধ। জন্ম লগ্নে সুরেন মা কে হারিয়েছে। মায়ের দুধ সে পায়নি।

 

মাগিটা চেয়ারে বসে দুলতে থাকে। আর তার থলথলে বুকটা দুলে দুলে ওঠে দুলুনির তালে তালে। পেছন থেকে চেয়ারের উপর ঝুঁকে পড়ে স্তন দুটোকে গভীর দৃষ্টিতে দেখতে থাকে সুরেন।

 

মেয়ে মানুষ টা আরও খিল খিল করে যেন হেসে ওঠে।সুরেন কি চায় সে যেন বুঝে ফেলেছে।

 

আশপাশটা ভালো করে চেয়ে নেয় সুরেন। মেয়ে মানুষ টা এখনো হাসছে কুড়-কুড়ানি হাসি। না আসে পাশে কেউ নেই। মাগী টা ভীষণ সাহসী, একাই বুকের হুক গুলো পটপট করে খুলতে লাগলে; সুরেনের মনে হল এক টানে সে ছিঁড়ে ফেলে ব্লাউজ টা। বুকটা চটকে চটকে ফাটিয়ে দেবে সে। সুরেন যখন এমন সব ভাবছে তখন দেখে; মেয়ে ছেলেটার স্তনবৃন্ত টা চুষে খাচ্ছে একটি শিশু।

 

সুরেন ভুরু কুঁচকে বলে, - কে ও?

মেয়েছেলে টা বলে,-তুমি গো। চিনতে পারছ না।

সুরেন জোঁকের মত দুধ কামড়ে থাকা বাচ্চা টাকে টেনে ছাড়ায়। বাচ্চা টা কেঁদে ওঠে। খুব জোরে স্পন্দিত হতে হতে হৃদপিণ্ড টা যেন থেমে যায় সুরেনের। লোভ সামলাতে পারেনা সুরেন। সুরেন হাত বাড়ায় মেয়ে মানুষটার বুকের দিকে।

 

আর ঢলানি মেয়ে ছেলেটা বুকের হুক গুলো এঁটে নিতে নিতে বলে উঠলো, -পহলে পয়সা ফেংকো ফির প্যাস মিটাও বেটা।

 

সুরেন মনে মনে বলে উঠল। রেন্ডি দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। আর যেই না সে স্তন দুটোকে সজোরে চেপে ধরল, মরণ টিপুনিতে মেয়ে মানুষ টা ককিয়ে উঠল।

- বাবাগো কি জোরে টেপও। কত বছর টেপনি গো।

 

গলগল করে বেড়িয়ে এলো বীর্য। লুঙ্গি নোংরা হয়ে গেল। আর ঠিক প্রথমবার আয়নাতে সুরেন মেয়ে মানুষ টার মুখ দেখতে পেলো। মুখটা তার চেনা চেনা লাগল। সে মনে করার চেষ্টা করতে লাগল কোথায় দেখেছে তাকে। তড়িৎ গতিতে মানিব্যাগটা বের করে সুরেন। আর মানিব্যাগের ভেতর থেকে তার মায়ের একমাত্র স্মৃতি চিহ্ন ভোটার কার্ডটা বের করতেই সে যেন চারশো চল্লিশ ভোল্ট কারেন্ট খেয়ে পড়ে গেল মাটিতে। সুরেন কাঁপতে থাকে মেয়ে মানুষ টা তার মা। মেয়ে মানুষটা আবার আগের মত হাসতে থাকে। পা এগিয়ে দেয় সুরেনের থাই বেয়ে পা টা এগিয়ে আসে তার লিঙ্গের দিকে। আর যেই না সেই আদুরে পায়ের তলায় লিঙ্গটি সজোরে দলিত হয়। সুরেন চিৎকার করে উঠে বসে।

 

আর ঠিক তখনই সুরেনের ঘুম ভেঙ্গে যায়। মাটিতে নয়। সুরেন শুয়ে আছে তার সেলুনের বাঁশের নির্মিত বেঞ্চ এর ওপরে। সুদূরে বটতলায় বসে আছে, খদ্দের শূন্য ফকিরচাঁদ বাবা। লক-ডাউনে তারও রাস্তার কুকুর গুলোর মত দশা। খাবার জোটে না। তবু মুখে অম্লান হাসি রেখে বলল।

-"না য়ে সচ না বো সচ! কুছ ভী সচ নহী হ্যায় বেটা।"

 

সুরেনের মনে পড়লো ফকির চাঁদ বাবার বলা রাজা জনকের গল্প টা।

 

রাজা জনক ঘুমচ্ছিল সুখ নিদ্রায়। সেনাপতি এসে খবর দিল; মহারাজ বহিঃশত্রু আপনার রাজ্য আক্রমণ করেছে। সুখ নিদ্রা ছেড়ে রাজা যুদ্ধে গেলেন। শক্তিশালী বহিঃশত্রুর হাতে রাজা পরাজিত ও বন্দী হলেন। দয়া পরবশত রাজ্য টুকু কেড়ে নিয়ে মহারাজা  কে তার শত্রু নৃপতি ছেড়ে দিয়েছেন। রাজা তখন রাজা নয়। রাজ্য ছেড়ে রাজ্যের সীমানা ডিঙ্গিয়ে ভিখিরির মত বনে জঙ্গলে লুকিয়ে লুকিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। অন্য দেশে ঘুরতে ঘুরতে প্রচণ্ড ক্ষুধা তৃষ্ণায় তার নাড়ি ছিঁড়ে যাচ্ছে। এক জায়গায় এক ধনী আর্ত - পীড়িতের সেবায় খাদ্য দ্রব্য দান করেছিলেন। রাজা সেই ভিক্ষুকের সারিতে এসে দাঁড়ালেন। ভিক্ষুকের সারি চলল এগিয়ে এক এক করে। আর যখন রাজা দান সামগ্রীর লাইনে দাতার সম্মুখে পৌঁছল; দাতা করজোড়ে গ্রহীতা জনকের দিকে প্রণাম জানিয়ে বললেন;

- ক্ষমা করবেন আর দানের সামগ্রী নেই। সব ফুরিয়ে গিয়েছে। ক্ষুধার্ত জনক তখন খিদের জ্বালায় দাতার উদ্দেশ্যে বললেন, - মহামান্য খাদ্য-পাত্রের তলানিতে যদি কিছু অবশিষ্ট থেকে থাকে দয়া করে আমায় দান করুন। তিন দিন আমি কিছুই খাইনি। আমি ক্ষুধার্ত।

 

তখন দাতা সেই খাদ্য-পাত্রের তলানি কাঁচিয়ে সামান্য খাদ্যদ্রব্য দিলেন মহারাজের হাতে। আর মহারাজ জনক যেমনি খাদ্য দ্রব্য হাতে পেয়ে আকাশের দিকে চেয়ে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ জানাতে গেলেন।

 

আর ঠিক তখনই, একটা চিল কোথা থেকে উড়ে এসে এমন ছোঁ মারল, যে, সেই সামান্য কয়েক দানা খাদ্যদ্রব্যও রাজার হাত থেকে মাটিতে ধুলোয় পড়ে নষ্ট হল। ক্ষুধার্ত রাজা যখন খিদের জ্বালায় ধুলোয় মলিন খাদ্যের জন্য হাহাকার করে ওঠে। হে বিধাতা এ কোন কঠিন পরীক্ষায় ফেললে তুমি।

রানি ছুটে আসে, -মহারাজ আপনি কি অসুস্থ বোধ করছেন।

 

আর ঠিক সেই সময় রাজার ঘুম ভেঙে যায়। রাজা বুঝতে পারেন এতক্ষণ তিনি যা দেখেছেন তা সবই স্বপ্ন। তিনি রাজপ্রাসাদেই আছেন। কিন্তু দার্শনিক জ্ঞানী রাজার মনে একটি প্রশ্ন উদয় হল। বো সচ না ইয়ে সচ। স্বপ্ন সত্য না বাস্তব? রাজার রাজ্যপাটে মন নেই। ঘুম খাওয়া কিছুই নেই।কেবলই বলেন বো সচ যা ইয়ে সচ। বদ্যি হাকিম কবিরাজ এসেও রাজার রোগ ধরতে পারেন না। এরকম অবস্থায় অষ্টাবক্র মুনি জনক রাজার রাজসভায়; রাজা জনক কে বলেছিলেন।

-না য়ে সচ না বো সচ। কুছ ভী সচ নহী হ্যায়। সাচ তো আপ হ্যায় মহারাজ। তত্ত্বমসি!

 

সুখ,দুঃখ কোনটাই স্থায়ী নয়। মৌসুমি বায়ু, আসে আর যায়, অর্থ নিরর্থ, কোনওটা সত্যি নয়। রাজা যখন রাজ্য সুখে মগ্ন-ছিল সেটি যেমন মিথ্যে। পরাজিত রাজার দুঃখ দারিদ্র সেটাও সত্যি নয় স্থায়ী নয়। হার জিত সবই মিথ্যা সবই আপেক্ষিক। সবই সাময়িক। সবই একটি ঘোর। স্বপ্নের মত। একটি অভিজ্ঞতা। একটি অবস্থা। অবস্থান বদলায়। পরিবর্তন হয়। কেবল আত্মা বদলায় না। নানা অবস্থার ভেতর দিয়ে চলতে চলতে তাকে আগে যেতে হয়। কিন্তু কোন অবস্থাই তাকে স্পর্শ করতে পারেনা। প্রভাবিত করতে পারে না। জামা বদলালে কি মানুষটা বদলে যায়। তা যেমন বদলায় না। তেমনি শরীর বদলায়। আত্মা না।

 

ফকির চাঁদ বাবার কথাগুলো মনে করতে করতে সুরেন নাপিত বুঝল; তার স্বপ্ন দোষে নোংরা লুঙ্গিটা বদলানো দরকার। কিন্তু রোদে মেলার সময় একটু চোখে চোখে রাখতে হবে। আবার কেউ নিয়ে চলে গেলে বিপদ। সুরেনের মনে হল জীবন যাপনের জন্য আড়ম্বরের সঞ্চয়ের হয়তো কিছুই থাকবে না। তবে বেঁচে থাকার জন্য প্রাণ ধারণের জন্য; এই বটগাছটিও চিরস্থায়ী দাঁড়িয়ে থাকলেও শিকড় খালের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলেছে। সুরেন যখন এসব ভাবছে; বটতলায় বসে ফকির চাঁদ বাবা চেঁচিয়ে উঠল, -শিব শম্ভু। সোচ মত খীঁচো তস্বীর। মুখে মাস্ক পরে চাল ডাল বিলতে আসা কতগুলো লোক ফকির চাঁদ বাবার সাথে সেলফি তুলছে। সুরেনও একটা বড় চাল ডাল তেল মসলার প্যাকেট পেয়ে মনে মনে ভাবল স্নান সেরে সবকিছু নিয়ে খিচুড়ি বসিয়ে দেবে।

 

সুরেনের আবার মনে হয়। সত্যিই বোধহয় সে একটু বেশি ভাবছে। বট গাছটি তার জ্ঞানের ঝুড়ি মাথায় নিয়ে এত ভাবনা চিন্তা করে কি? সে আর ফকির চাঁদ বাবা দিব্যি একসাথে বসে বসে দিন কাটায়। খাল পাড় দিয়ে ময়লা জল বয়ে যায়। রসদ জুটে যায় কোন না কোন ভাবে বাঁচার।


ফিরুন সূচিপত্রে



| হিম সংখ্যা-১৪২৮| aleekpata.com|
  |ALEEK PATA- Your Expressive World |Online Magazine |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty|
 Winter , 2021 | August -December 2021 | Fifth Year  Second  Issue |28 th Edition|
|© All Rights Reserved By The Editor and The Publisher |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |

গল্প- কলতলা -সুনীল কর্মকার

 কলতলা

সুনীল কর্মকার

Image Courtesy: Google Image Gallery
 

‌‌‌এ পাড়ার মেয়েদের বিয়ে সাধারণত মেয়েদের নিজেদের কেই ঠিক করে নিতে হয়। মোবাইল চালু হওয়াতে কাজটি বেশ সহজ হয়েছে। মোবাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে দুজন-দুজনের আলাপ। তারপর কাছাকাছি। তারপর বিয়ে। বিয়ের আগে একটু ফস্টি নষ্টি, একটু হাত ধরাধরি, টুকটাক খাওয়া। মেয়েরা একটু বড়ো হলেই নিজেরা সচেতন হয়ে ওঠে। বাবা-মা এবিষয়ে খুব একটা নাক গলায় না। কী করেই বা নাক গলাবে? ওপার থেকে শ্যাওলার মতো ভাসতে ভাসতে এ পারে ঠেকা। চালচুলো হারিয়ে কোন রকমে একটু আশ্রয়। ফাঁকা জায়গায় ত্রিপল খাটিয়ে থাকতে থাকতে, ফুটে দোকান দিয়ে কিংবা হকারি করতে করতে কেউ কেউ সস্তায় জলা জমি কিনে চারটা পিলার দাঁড় করিয়ে মাথার উপর একটি ছাদন দিয়ে ঘর বানিয়ে সংসার। একটু বেশি বৃষ্টিতেই ঘরের ভিতর জল। তারপর  মশা ,সাপ এসব তো আছেই। ঘরে ঘরে ডেঙ্গি, ম্যালেরিয়া, জণ্ডিস। পেটের চিন্তায় ছেলেমেয়েদের দিকে তাকাতেই পারেনা। সচেতন বাবা মা হলে স্কুলে পাঠায় নতুবা ছোট থেকেই রোজগারের ধান্দায় নেমে কেউ বনে যায় জেল ফেরৎ খোকা , কিংবা নেতার পিছু পিছু ঘুরতে ঘুরতে মোনা মস্তান।

মেয়ের বিষয়ে কানাঘুষো কিছু শুনতে পেলে মা সাবধান করে দেয়, “দেখে শুনে পা দিস। শেষকালে যেন চোখের জল ফেলতে নাহয়”।  ব্যস এটুকুই, সেটা কথার কথা। বেশ হাসি-খুশি নিয়ে প্রিয় মানুষ টার সাথে হাত ধরে বেরিয়ে একরাশ বিষন্নতা নিয়ে ফিরে আসে বছর না ঘুরতেই। কেউ কেউ লাঠি ঝাঁটা খেতে খেতে একদিন অসহ্য হলে জীবনটাকেই শেষ করে দেয়। মৃত্যুর একটা খবর ওপাশ থেকে ভেসে আসে। তারপর সব চুপচাপ। যারা ফিরে আসে তাদের অন্য এক জীবন শুরু হয়। সে এক কঠিন লড়াই। কারো লেখাপড়া থাকলে সামান্য টাকায় কল সেন্টার অথবা শপিংমলে জায়গা পায়। আর নাহলে ভাসতে ভাসতে কে কোথায় গিয়ে ঠেকবে কেউ জানতেও পারেনা।

 

পাড়ার পুরুষদের এসব বিষয়ে উৎসাহ না থাকলেও মেয়েরা কিন্তু কল তলায় জল ধরতে গিয়ে রসিয়ে রসিয়ে এসব নিয়ে কলতলাকে জমিয়ে রাখে। কোন্ মেয়ে কোথায় যায়, ক’টায় ফেরে, কোন্ ছেলের সঙ্গে কোথায় দেখেছে-সেসব নিয়ে মুখরোচক গল্প চলতেই থাকে যতক্ষণ না পর্যন্ত জল পড়া বন্ধ  হচ্ছে। জলের শব্দ বন্ধ হলে তবেই গল্পের শেষ  হয়। আবার পরের দিন সেই একই, চলতেই থাকে দিন-মাস-বছর ধরে আলোচনা।

 

 মধুজা  মায়ের কাছে বেশ কদিন ই এসেছে। বছর খানেক আগে বিয়ে করেছে। শহরতলি ছাড়িয়ে মেদিনীপুরের কোন এক গাঁয়ে নাকি তার শ্বশুর বাড়ি। মোবাইলে যোগাযোগ। দীপঙ্কর পড়তে এসে মোবাইলে মধুজাকে দেখেছিল। দীপঙ্করের চেহারা, কথাবার্তা , স্মার্টনেস দেখে মধুজার বেশ পছন্দ হয়েছিল। ক্রমশঃ দীপঙ্করের আসা -যাওয়া শুরু হলো মধুজাদের বাড়িতে। পাড়ার অনেকেই দেখেছে। দীপঙ্কর বলেছিল “চাকরি না পেলে তার পক্ষে বিয়ে করা সম্ভব নয়। অপেক্ষা করতে হবে”,  বছর দুই অপেক্ষার পর ওরা বিয়ে করে। সাধ্যমতো অনুষ্ঠান করে, পাড়ার অনেককে নিমন্ত্রণ করে খাইয়েছিল। মধুজার প্রিয় বান্ধবী শ্রীময়ী বুঝিয়েছিল “আমার মতো তুই যেন ভুল করিস না। এখনকার ছেলেদের বিশ্বাস করা ঠিক নয়”।  শিলিগুড়ির রতন এপাড়ায় প্রাইভেট কোম্পানিতে কাজ করতে করতে শ্রীময়ীর সাথে ভাব জমে। ঐ পাড়াতেই ভাড়া থাকতো রতন। দেশের বাড়ি, জায়গা জমির কথা বলে অনেক স্বপ্ন দেখিয়েছিল। কোম্পানি বন্ধ হলে দেশে গিয়ে শ্রীময়ী দেখে সব উল্টো। থাকার একটিই ঘর। টাকা পয়সা সামান্য যা ছিল তাতে করে একটা টোটো কিনে চালাতে শুরু করে। শহরে হাজার হাজার টোটো। রোজগার ও সব দিন হয়না। যা রোজগার তা আবার জুয়োর নেশায় উড়িয়ে দিয়ে নেশা করে ফাঁকা হাতে বাড়ি ফিরে শ্রীময়ীর উপর জোর জুলুম। হাত ও উঠতে লাগল শ্রীময়ীর উপর। অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে একদিন পালিয়ে এলো মায়ের কাছে।

এসব ঘটনা মধুজা সবই জানতো। তবু দীপঙ্করকে অন্যদের থেকে আলাদা মনে হয়েছিল। রেনু কাকীমারা সেই নিয়েই মধুজার পিণ্ডি চটকাচ্ছিল। বিশাখা পিসি বলে –“দ্যাখো ক'দিন পরেই শুনবে ওখানকার পাট চুকিয়ে চলে এসেছে ও । যাবার নাম গন্ধ আছে?

 

রেনু কাকীমা বিশাখার কথার খেই ধরে বলে, “হ্যাঁ গো আগে কত্তো হাসিখুশি থাকতো। সেই ছোট্ট থেকে দেখছি-আমাদের ঘরে তো পড়েই থাকতো। এসে থেকে মাত্র গোনাগুন্তি একদিন কিছুক্ষণের জন্য এসেই চলে গেল। আমার বাপু ক্যামন ক্যামন লাগলো..."

কনিকা বলে, “না না ও ওরকম নয় ই। লেখাপড়া জানা মেয়ে। এখানে স্কুলে পড়াতো...”

-“তুই আর বলিস না বাপু, কত টুকুই বা ওকে চিনিস? বড়ো প্যাঁচালো,” রেনু বলে ।

বিশাখা বলে, “বিয়েটা নামমাত্র। দ্যাখো এখানে কার সঙ্গে ফেঁসে আছে। ওর প্রিয় বান্ধবী টাকে দেখছো না-উড়ে বেড়াচ্ছে। ওর মতো এও হবে। মনের মিল নাহলে বন্ধু হয়?

ইতিমধ্যে কলে জল এসে গেছে। মধুজা তাড়াতাড়ি আসছে বালতি হাতে কলতলায়। ওকে  দেখে সবাই প্রসঙ্গান্তরে চলে গিয়ে জল ও ধরে কথাও চলে। রেনু কাকীমা মধুজাকে উদ্দেশ্য করে বলে, “কি রে! জল নিবি? তোর মা?

-“মাকে বললাম তুমি থাকো,আমি যাচ্ছি। যদ্দিন আছি তোমাকে কষ্ট করতে হবেনা”।

উপস্থিত সবাই এ-ওর মুখের দিকে তাকায়। চোখ বড়ো বড়ো করে রেনু কাকীমা বলে—“সে কীরে এই তো কবে এলি? এর মধ্যেই চলে যাবি?

-“হ্যাঁ গো কাকিমা ওরাতো আসতেই বারণ করছিল। আমিই জোর করে এসেছি। আবার কখন আসবো কে জানে?

সবাই আরো কাছাকাছি এসে ততক্ষণে মধুজাকে ঘিরে একটা বৃত্ত তৈরী করে ফেলেছে।

-“কখন আসবি মানে?” বিশাখা ভীষণ কৌতুহল নিয়ে জিজ্ঞেস করে।

-“না মানে তোমাদের জামাইয়ের তো প্রোমোশন হয়েছে। ম্যানেজার হয়ে বাংলার বাইরে চলে যেতে হবে। কোথায় যেতে হবে এখনো জানা যায়নি”, মধুজা বলে।

খবরটা শুনেই কলতলার কলকাকলি থেমে গিয়ে নিস্তব্ধতার গভীরে যেন ঝিমিয়ে পড়ল। সে দৃশ্য মধুজার চোখে কতখানি ধরা পড়ল সেটা মধুজাই বলতে পারবে তবে নীরবতা ভেঙে মধুজার পিঠ চাপড়ে রেনু কাকীমা বলল, “বড়ো ভালো মেয়ে তুই রে। দেখবি তোর কোন কষ্ট হবেনা, তোরা এলে আমাদের যেমন ভালো লাগে, তেমনি যাবার কথা শুনলেই মনটা খারাপ হয়ে যায়রে”।  উপস্থিত সকলেই ঘাড় নাড়িয়ে কথাটাকে সমর্থনের ভঙ্গিতে বলে, “সত্যিই মনটা খারাপ হয়ে যায়  রে”।

ফিরুন সূচিপত্রে



| হিম সংখ্যা-১৪২৮| aleekpata.com|
  |ALEEK PATA- Your Expressive World |Online Magazine |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty|
 Winter , 2021 | August -December 2021 | Fifth Year  Second  Issue |28 th Edition|
|© All Rights Reserved By The Editor and The Publisher |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |

Main Menu Bar



অলীকপাতার শারদ সংখ্যা ১৪২৯ প্রকাশিত, পড়তে ক্লিক করুন "Current Issue" ট্যাব টিতে , সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা

Signature Video



অলীকপাতার সংখ্যা পড়ার জন্য ক্লিক করুন 'Current Issue' Tab এ, পুরাতন সংখ্যা পড়ার জন্য 'লাইব্রেরী' ট্যাব ক্লিক করুন। লেখা পাঠান aleekpata@gmail.com এই ঠিকানায়, অকারণেও প্রশ্ন করতে পারেন responsealeekpata@gmail.com এই ঠিকানায় অথবা আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

অলীক পাতায় লেখা পাঠান