অলীক পাতার অন্যান্য সংখ্যা- পড়তে হলে ক্লিক করুন Library ট্যাব টি



। । "অলীক পাতা শারদ সংখ্যা ১৪৩১ আসছে এই মহালয়াতে। । লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ১৫ ই আগস্ট রাত ১২ টা ।.."বিশদে জানতে ক্লিক করুন " Notice Board ট্যাব টিতে"

Saturday, April 25, 2020

বড়গল্প-কেলুদার 'সংকটময়' কেস-সায়ন্তনী পলমল ঘোষ

কেলুদার 'সংকটময়' কেস
সায়ন্তনী পলমল ঘোষ
অলঙ্করণঃ মিঠুন দাস

কেলুদা মন দিয়ে হাতের ছবিখানা দেখছিলেন। টেবিলে আরও কয়েকটা পড়ে আছে। শার্লক হোমসের গেট আপটা চিরকালই কেলুদার পছন্দের কিন্তু মুশকিল হল ঠোঁটের ফাঁকে পাইপ ছাড়া শার্লক হোমস ইনকমপ্লিট আর কেলুদার আবার তামাকজাত দ্রব্যে এলার্জি। সেই ক্লাস টেনে পড়ার সময় সহপাঠিনী ললিতার কাছে হিরো সাজার জন্য সিগারেটে সুখটান দেওয়ার চেষ্টায় অসুখই বাধিয়ে বসেছিলেন। ললিতা তো তার পাশের বাড়ির পলাশের হাতে হাত চোখে চোখ রাখলোই তার ওপর বাবার সেই ট্যমেটোর মত গোল গোল রক্তচক্ষু এখনও মনে পড়লে কেঁপে ওঠেন কেলুদা। তাই অগত্যা হোমস বাদ। এবার হাতে উঠে এল ব্যোমকেশবেশি আবীরের ছবিখানা কিন্তু এখানেও মুশকিল। ওই বিয়ের দিন বড় জামাইবাবু সেই যে ধুতি পরিয়ে দিয়ে বিয়ে করতে নিয়ে গিয়েছিলেন তারপর থেকে সে ধুতি যত্ন সহকারে হাতে হাতকড়া পড়ার স্মৃতি হিসেবে আলমারীতে তোলা আছে। জীবনে আর কখনও ধুতি পরেন নি কেলুদা তাই এটাও ম্যানেজ করা যাবে না। একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কেলুদা মনে মনে সত্যজিৎ রায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানালেন," সত্যিই আপনি অনন্যঅসাধারণ। ফেলুদাকে কত সাধারণ পোশাক পরিয়েই অসাধারণ করে তুলেছেন আপনি। প্যান্ট-শার্টকত সহজে ক্যারি করা যায়। ধুতির কোঁচা খোলার ভয় নেইপাইপের ধোঁয়া খেয়ে কাশির ভয় নেই তারওপর গরমের সময় ওভার কোট পরে ভেপে যাওয়ার চান্স নেই।"  কেলুদা ওরফে কালোসোনা মিত্র হলেন " ঈগলের চোখ" ডিটেকটিভ এজেন্সির কর্ণধার। ছোটবেলা থেকেই পড়ার বইয়ের ফাঁকে দস্যু মোহনপাঁচকড়ী দে ছিল কেলুদার নিত্যসঙ্গী। একটু বড় হবার পর তো হোমসএরকুল পয়রোব্যোমকেশ এরা কেলুদার আরাধ্য দেবতার জায়গায় উন্নীত হয়েছিলেন। ঠিক যেই সময়টা কেলুদা ভাবতে আরম্ভ করেছিলেন যে এবার ভারতবর্ষের বুকে কল্কি অবতারের মত আবির্ভাব ঘটবে দুধর্ষদুঃসাহসী ডিটেকটিভ কে এস মিটারের ঠিক সেই সময়ই কেলুদার বাবা ঘেঁটি ধরে ঢুকিয়ে দিলেন রেলের চাকরীতে। সারা জীবন রেলের চাকায় পিষ্ট হবার পর যখন রিটায়ারমেন্ট করলেন আর কারুর বাধা মানেন নি কেলুদা নিজের বাড়ির একতলায় খুলে বসেছেন," ঈগলের চোখ।" নিয়মিত যোগ ব্যায়াম করে শরীরটা এখনও একদম সুস্থ সবল রেখেছেন। দেখলে পঞ্চাশের বেশি মনে হয় না। কেলুদার গোয়েন্দাগিরিতে সাফল্যও নেহাত মন্দ নয়। মার্জার মার্ডার কেসকুকুর কিডন্যাপিংলাউ-কুমড়ো চুরির কেস তো অহরহই আসে। মাঝেসাঝে মানুষের কেসও পেয়ে যান।
"মে আই কাম ইন?" কেলুদা চোখ তুলে দেখলেন ধোপদুরস্ত প্যান্ট-শার্ট পরা বছর পঁয়ষট্টির এক ভদ্রলোক দরজায় দাঁড়িয়ে। 
"পকেটভারী কেস মনে হচ্ছে।" মনে মনে একথা বললেও কেলুদা স্টাইল করে মুখে বললেন, "ওহ ইয়েসকাম ইন।" ফেলুদা আর হোমসের মিক্সচার কায়দায় ভদ্রলোককে সামনের চেয়ারটায় বসার ইঙ্গিত করলেন।  ধপ করে বসেই ভদ্রলোক ঢকঢক করে সামনের গ্লাসের পুরো জলটা খেয়ে ফেললেন তারপর কেলুদাকে কোনও সুযোগ না দিয়ে পুলিশদের মত বাঁজখাই গলায় প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু করলেন, " আপনি গোয়েন্দা?"
"হুম।"
"ওকেআমার কেসটা আপনাকে নিতেই হবে। নুটুটাকে টাইট দিতেই হবে। আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছে ব্যাটা। ওর ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্নভিন্ন করতেই হবে আপনাকে। দেশের জন্য দশের জন্য করতেই হবে আপনাকে। করতেই হবে।" উত্তেজনায় নেতাদের মত কাঁপছেন ভদ্রলোক।
"হুম।"
"কি হুম হাম করছেন। পারবেন তো?" খেঁকিয়ে উঠলেন এবার।
"হুম।"
"ঠিক আছে।"
"তা নুটুটা কে?" মিউমিউ করে বললেন কেলুদা।
"নুটুআরে নিউটন কুমার মুখুজ্জেবিজ্ঞানী। আমেরিকায় থাকত। আমার প্যান্টে হিসি করা বয়সের বন্ধু।"
"ওহতা আমার কাজটা কি বললে একটু ভালো হত মানে কি কারণে ওই ইয়ে করা বয়সের বন্ধুর জন্য আপনি এখানে এসেছেন। আর আপনার নামটা?" গলা মাখনের মত নরম করে বললেন কেলুদা।
"আরে আমাকে চেনেন না! আয়াম দ্য গ্রেট সংকট চরণ চাটুজ্জে। দীর্ঘদিন ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট ডিপার্টমেন্টের বড় অফিসার ছিলাম। "
 এরপর ভদ্রলোক আবার শুরু করলেন। দুরন্ত এক্সপ্রেসের গতিতে যা বললেন তার মর্মার্থ হল এই যে তাঁর ছেলেবেলার বন্ধু নুটু ওরফে বিজ্ঞানী নিউটন কুমার মুখুজ্জের কর্মকান্ড দেখে  সম্প্রতি তাঁর মনে সন্দেহ হয়েছে যে নুটু গোপনে ভয়ানক কোনও এক্সপেরিমেন্ট করছে কারণ যে নুটু আগে তাঁকে ডেকে হেঁকে তার আবিষ্কৃত কোষ্ঠকাঠিন্য নিরোধক চা খাওয়াতো সেই নুটু এখন তাঁকে এড়িয়ে যাচ্ছে। বাড়ির বাইরে থেকে বিদায় করে দিচ্ছে। ভালো করে কথা  পর্যন্ত বলছে না। একদিন তো নুটুর রোবট কুকুরটা পর্যন্ত তাঁকে দেখে দাঁত কিড়মিড় করছিল। তাছাড়া নুটুর বাড়িতে সন্দেহজনক লোকজনও দেখা গেছে। সবমিলিয়ে সংকট চরণের মনে ঘোরতর সন্দেহ যে নুটু ভয়ানক কোনও কিছু করতে চলেছে যে কারণে আমেরিকার অত দামি চাকরী ছেড়ে এই বয়সে পৈতৃক ভিটেতে চলে এসেছে। মুখে বলছে আর বিদেশে ভালো লাগছে না কিন্তু পেটে অন্য মতলব আছে মনে হচ্ছে। কর্মজীবনের অভিজ্ঞতার দরুণ সংকটচরণ সংকটের গন্ধ আগে থেকে পেয়ে যান।  দীর্ঘদিন কাজের সূত্রে মানুষের সংকটে তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছেন তাই তিনি মনে করেন ভারতবর্ষকে নিউটন মুখুজ্জে নামক সংকটের হাত থেকে উদ্ধার করতে তাঁকেই সংকটমোচনবিপত্তারণ সব হতে হবে। ছোটবেলার বন্ধু বলে খুব খারাপ লাগছে। ছোটবেলার খেলার স্মৃতিকিশোর বেলার দুস্টুমির স্মৃতিযৌবনের একসাথে এগরোলের স্মৃতি সব যেন ডাউনলোড হয়ে মনের মধ্যে রিপিট টেলিকাস্ট হচ্ছে কিন্তু দেশের স্বার্থে দশের স্বার্থে তিনি আর কোনও দিন ফ্রেন্ডশিপ ডে পালন করবেন না। 
"তা আমাকে কি করতে হবে?" আলতো করে জিগ্যেস করলেন কেলুদা।
"আপনি তো আচ্ছা আহাম্মক মশাই। এখনও বুঝতে পারলেন না যে নুটুর প্ল্যান কি সেটা খুঁজে বের করে আমাকে জানাতে হবে! আমি জানাবো পুলিশ কিংবা সি বি আই কে। কাউ ডাং ভরা মাথায় কি করে যে গোয়েন্দা হয়েছেন!"  
অপমানটা হজম করতে কেলুদার যথেষ্ট কষ্ট হল কিন্তু কেসের ওজন আর সংকট চরণের পার্স থেকে বেরোনো কাগজগুলোর ওজনের কথা ভেবে হজমলা ক্যান্ডি খেয়ে নেবেন ভাবলেন। অগ্রিম বাবদ এই টাকা পেয়েছেন জানলে গিন্নী তাঁর এই নতুন পেশাটাকে আর ঝাড়ুর আগায় উড়িয়ে দিতে পারবে না। 

       উফফকি মশা নিউটন মুখুজ্জের বাগানে!  মুখুজ্জে মনে হচ্ছে মশাগুলোর জিনের পরিবর্তন ঘটিয়ে ওদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছে নাহলে এমন গোরুর ইনজেকশনের মত সুঁচ ফোটাচ্ছে কি করে! কেলুদা অনেক কষ্টে হাঁচোড় পাঁচোড় করে পেছনের ভাঙ্গা পাঁচিল দিয়ে বাগানে ঢুকেছেন। মুখুজ্জে লোকটা বোধহয় হাড় কিপ্টে। পাঁচিলটা মনে হচ্ছে ওর দাদুর দাদুর আমলের কিন্তু সেটা মেরামত করার কোনও ব্যবস্থাই করে নি অবশ্য মেরামত করে ফেললে আজ কেলুদার অবস্থা খারাপ হয়ে যেত। এতেই পাঁচিল থেকে কাঁটা ঝোপের ওপর লাফিয়ে পড়তে গিয়ে কনুইতে ছুড়ে গেছে। গাল চিরে বিন্দু বিন্দু রক্ত বেরোচ্ছে।  অতি সন্তর্পণে কেলুদা পা টিপে টিপে একতলার ঈশান কোণের ঘরটার জানালা দিয়ে উঁকি দিলেন। শীতের দিনে সন্ধ্যে নেমে গেছে বলে যাই হোক কেলুদাকে কেউ দেখতে পাবে না। সংকটচরনের কথা অনুযায়ী এই ঘরটাই নিউটন মুখুজ্জের গবেষণাগার। লোকটা নাকি বিজ্ঞানের সব বিষয়ে পারদর্শী। 
ধুর বাবা সব জানালাগুলো শক্ত করে লাগানো। অন্য ঘরে দেখতে হবে। একবার চারিদিকে তাকিয়ে নিলেন কেলুদা। নাহমুখুজ্জের এই বিশাল বাগানে শুধুই বড় বড় গাছপালার নিচে থোকা থোকা অন্ধকার। জন মনিষ্যির গন্ধ নেই কিন্তু গোয়েন্দা কে এস মিটারের গন্ধ পেয়ে যদি এইসব পুরোনো গাছ থেকে এক দু পিস রামচন্দ্রের প্রতিপক্ষ দলের সদস্য নেমে আসে তাহলে তো...। একটা বেলগাছও আছে।
"শোনরোরোসাবধানে যাবে। কাজটা কতটা জরুরি বুঝতেই পারছ।"
"ওকে বসডোন্ট ওরি। ইট উইল বি ডান"   হাসতে হাসতে বলল লোকটা। কথাবার্তার আওয়াজ শুনে জানালার একচিলতে ফাঁক দিয়ে কেলুদা দেখলেন ঘরের মধ্যে দুজন মানুষ। কেলুদার দিকে  যিনি মুখ করে আছেন তাঁর কর্মকাণ্ডের কল্যাণেই কড়কড়ে নোটগুলো কেলুদার পকেটে ঢুকেছে। অন্য ব্যক্তিটি পেছন ফিরে থাকলেও জামাকাপড়ের ফাঁক দিয়ে তার  গায়ের রঙ যেটুকু দেখা যাচ্ছে তাতে সে যে বিদেশি তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। শীত কালেও গায়ে একটা পাতলা টি শার্ট আর বারমুডা আসলে ওদের সব দেশে তো হাড় কাঁপানোদাঁত কনকনানো ঠান্ডা পড়ে। তার মানে এ নিশ্চয় বিদেশী গুন্ডা কিংবা গুপ্তচর হবে। গুপ্তচর মনে আসতেই কেলুদার চোখের সামনে ভেসে উঠলো জেমস বন্ড অবতারে পিয়ার্স ব্রনসনরজার মুরড্যানিয়েল ক্রেগের চেহারাগুলো। নাহএই লোকটা গুপ্তচর নয় ওই গুন্ডাই হবে। 
"তাড়াতাড়ি যাও। ইটস আ কোয়েশ্চেন অফ লাইফ অর ডেথ।"
"ওকে বাই।"
লাইফ অর ডেথ! তারমানে সংকট চরণের সন্দেহই ঠিক। গন্ডগোল শুধু নয় এক্কেবারে খুনোখুনি কেস! নাহওই বদ বিদেশীটাকে খুন করা থেকে আটকাতেই হবে। যে দেশে কে এস মিটারের মত দুঁদে গোয়েন্দা আছে সেখানে এত সহজে মানুষ খুন করবি ব্যাটা! দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা। কেলুদার মনে একসাথে ভারত আমার ভারতবর্ষকদম কদম বাড়ায়ে যাবন্দেমাতরম সব বাজতে লাগলো।


    আগে আগে লোকটা একটা মান্ধাতার আমলের ক্যাঁচর ক্যাঁচর সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে আর পেছন পেছন কেলুদা চলেছেন তাঁর মোটর সাইকেল নিয়ে। সাইকেলকে অনুসরণ করার জন্য তাঁর মোটর সাইকেলের গতি গোরুর গাড়ির সঙ্গে সহজেই পাল্লা দিতে পারবে।
"ও দাদুএর চেয়ে হাঁটুন না। আগে পৌঁছবেন।" একটা বছর দশেকের বাচ্চা আওয়াজ দিল কিন্তু কেলুদা নিরুপায়। ব্যাটা বিদেশী কিলার কোথায়  হারলে-ডেভিডসনে চড়ে খুন করতে যাবে তা না একটা পঁচিশ বছরের পুরোনো বুড়ো হিরো সাইকেল নিয়ে চলেছে।  নিউটন মুখুজ্জে মনে হচ্ছে কিপ্টে টু দি পাওয়ার ইনফিনিটি। টাকাপয়সা বেশি দেবে না তাই এ ব্যাটা তেল খরচা বাঁচাচ্ছে। দেখতে দেখতে লোকটাকে ফলো করতে করতে ঘোষ পাড়ার ফুটবল মাঠের কাছে চলে এলেন কেলুদা। এদিকটা বেশ নির্জন। একটু তফাতে থেকেই অনুসরণ করছেন কেলুদা। লোকটা বুঝতে পেরে গেলে অনেক কিছু হতে পারে। কেলুদার হাতপা এমনকি পেটটাও গ্যাস বেলুনের মত ফুস হয়ে যেতে পারে।  আরে একী! কোথা থেকে একটা চার চাকা গাড়ী এসে ঝুড়ি থেকে কুমড়ো তোলার মত টপাক করে লোকটাকে সাইকেল থেকে তুলে নিল! ডাঙ্গায় খাবি খাওয়া কাতলা মাছের মত লোকটা হাত পা ছুঁড়ছিল কিন্তু কিছু করতে পারলো না। গাড়িটা স্পীড নিচ্ছে কিন্তু গোয়েন্দা কে এস মিটার যে অকুস্থলে উপস্থিত তা ওদের জানা নেই। মনে হচ্ছে নিউটন মুখুজ্জে আন্ডার ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। এখন গ্যাং ওয়ার জাতীয় কিছুও হতে পারে মনে হচ্ছে। মনে মনে ভাবতে ভাবতে কেলুদাও পৃথ্বীরাজ চৌহানের মত ঘোড়া, থুড়ি বাইক ছোটলেন। গাড়িটা অনেকখানি এগিয়ে গেছে।




     "তুই যে বলছিলি একটা লোককে মুখুজ্জের বাগানে চুপিচুপি ঢুকতে দেখেছিস?"
"ও গুরুলোকটা ভদ্দর জামাকাপড় পরা চোর মনে হল।"
"নে মুখুজ্জেকে ফোন লাগা।"
বাড়ির পেছন দিকে জানালায় আড়ি পাতা কেলুদার কান দুটো গরম হয়ে উঠলো। একজন গোয়েন্দাকে চোর ভাবছে! একদম সাবস্টান্ডার্ড গুন্ডা।
"মুখুজ্জে তোমার নতুন আবিষ্কার আমাদের একহাতে দাও আর অন্য হাতে তোমার নাতিকে নাও ব্যস সিম্পল ব্যাপার।" কানে ফোন নিয়ে ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে কথা বলছে গুন্ডাটা।
মুখুজ্জের নাতি! চেয়ারে বাঁধা লোকটার মুখটা ভালো করে দেখতে পেলেন কেলুদা। মুখে টেপ আটকানো থাকলেও বুঝতে পারলেন বছর সাতের বয়স হবে ছেলেটার। তবে চেহারাটা হাট্টাকাট্টা আর চুল কালো হলেও চোখগায়ের রং সব বিদেশীদের মত। মুখুজ্জের নতুন অবিষ্কারটা কি রে বাবা যার জন্য কিডন্যাপিং কেস ঘটে গেল! কেলুদা তাঁর মগজাস্ত্র প্রয়োগ করার চেষ্টা করলেন। মুখুজ্জে লোকটার আবিষ্কার যাই হোক না কেন এই গুন্ডাগুলো যারা গোয়েন্দাকে চোর ভাবেবাইরে একটা পাহারা বসানোর মত বুদ্ধি নেই ঘটেতাদের হাতে পড়তে দেওয়া যায় না। তাঁকে নামতেই হবে যুদ্ধক্ষেত্রে। সংকটচরণকে টুক করে একটা মেসেজ করে পকেট থেকে বের করে ফেললেন পিস্তলখানা। এই মুহুর্তে নিজেকে ফেলুদার বড়দা আর জেমস বন্ডের ছোট ভাই মনে হচ্ছে কেলুদার। দরজা খোলাই রেখেছে আহাম্মকগুলো।
"হ্যান্ডস আপ।" 
"ও গুরুএতো মনে হচ্ছে নুটু মুখুজ্জের পাঁচিল টপকানো সেই চোরটা!"
"তা পিস্তল লিয়ে এখানে কি হিরো হওয়ার সাধ হয়েছে বুড়ো?"
"ডোন্ট কল মি চোর অন্ড বুড়ো। আয়াম দ্য গ্রেট ডিটেকটিভ কে এস মিটার। ছেলেটাকে ছেড়ে দাও।"
"বুড়ো টিকটিকি! খিক খিক খিক। ওরে ঘনা ধর ব্যাটাকে।" গুরুর আদেশ পাওয়া মাত্র ঘনা কেলুদাকে সটান কাঁধে তুলে একটা চেয়ারে বসিয়ে দিল।
"ওরেঘনা বুড়ো খেলনা পিস্তল লিয়ে এসেছে রে! খিক খিক খিক।"  কেলুদার পিস্তলটা নাচিয়ে বলল গুন্ডাটা। নগদ পাঁচশ টাকা দিয়ে একদম আসলের মত দেখতে ওই পিস্তলখানা কিনেছিলেন কেলুদা।
"রবিনকে ছেড়ে দাও। রবিনকে ছেড়ে দাও।" কেলুদা অবাক হয়ে দেখলেন দরজায় দাঁড়িয়ে সংকট চরণ। সত্যিই মানুষের সংকটে ছুটে আসা লোকটার স্বভাব। তবে চোখমুখগুলো কেমন যেন ফ্যাকাশেঅদ্ভুত লাগছে। মনে হয় সংকটকালে ওনার এরকম রূপান্তর ঘটে।
এই তুই কে রে?" ঘনার মুখ থেকে কথা বেরোতে না বেরোতে সংকট চরণ ঘনাকে দুহাতে তুলে গরাদ বিহীন বড় খোলা জানালা গলিয়ে বাইরে ফেলে দিল। ব্যাপারটা ঘনার গুরুর হজম হওয়ার আগেই তারও একই দশা হল। সংকট চরনের এই সুপার ম্যান অবতার দেখে কেলুদার মুখটা তো ক্রিকেট বল ঢোকার মত হাঁ হয়ে গেছে। হঠাৎ বাইরে ধুপধাপ আওয়াজ। পুলিশ এসেছে। দরজা দিয়ে প্রথমে ঢুকলেন নিউটন মুখুজ্জে আর তার পিছু পিছু সংকট চরণ। এই মুহুর্তে ঘরের মধ্যে দু দুজন সংকট চরণ। প্রথম জনের কোনও ভাবান্তর নেই কিন্তু দ্বিতীয় জন আঁতকে উঠলো," এ কেঅবিকল আমার মত দেখতেআমার তো কুম্ভমেলায় হারিয়ে যাওয়া যমজ ভাই নেই।"
"এ হলো আমার সৃষ্টি নতুন রোবটহিউম্যানয়েড। তোর মত দেখতে বানিয়েছি আর নামও তোর ডাক নামে সান্টু রেখেছি। ভেবেছিলাম তোকে জন্মদিনে সারপ্রাইজ দেব তাই কিছুদিন তোকে আর আমার বাড়িতে ডাকিনি কিন্তু এই মদন গুন্ডা সব ভণ্ডুল করে দিল। আমি রবিনকে দিয়ে রায় পাড়ার পিসীমার মেনি বিড়ালটার জন্য আমার আবিষ্কৃত একটা ওষুধ পাঠাচ্ছিলাম। সে ব্যাটার অতিরিক্ত ইঁদুর খেয়ে যায় যায় অবস্থা। পিসীমার তো প্রায় পাগল হওয়ার উপক্রম তাঁর পালিত পুত্রের এই মরণাপন্ন দশায়। মাঝপথে এই মদন আমার টাকে চুল গজাবার ওষুধের ফর্মুলা নেবে বলে এইসব কান্ড ঘটিয়ে ফেলল। ও তো আর জানে না যে রবিন বিপদে পড়ার সাথে সাথে রোবট সান্টু জানতে পেরে গেছে। রবিনের হাতের ঘড়িটা আসলে একটা মাল্টিপারস গেজেট। লোকেশন ট্র্যাক করা কোনও ব্যাপারই নয়।" রবিন আর কেলুদা চেয়ার বন্ধন থেকে মুক্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে।
"রবিন?"
"আরে আমার ভাইপো রনিতের ছেলে। ওর মা বিদেশী বলে ওইরকম দেখতে। কদিন আগেই এসেছে। ওকে তো ছোটবেলায় দেখেছিস তুই। ভুলে গেছিস মনে হয়। ও ইন্ডিয়ায় এসেছে আমার সাথে থাকবে বলে। নিজের পিতৃ পুরুষের জায়গায় কিছুদিন কাটাতে চায় ও। আচ্ছাএই ভদ্রলোক কে?" কেলুদার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করলেন নুটু মুখুজ্জে। সংকট চরনের নিজের অবস্থাই এখন সংকটাপন্ন। যে বন্ধু তাঁর মত দেখতে রোবট বানিয়েছে তাকে কি করে বলেন....।
"হ্যাললো মিস্টার মুখার্জীআয়াম ডিটেকটিভ কে এস মিটার। ওনার অফ ঈগলের চোখ ডিটেকটিভ এজেন্সি। আসলে কি হয়েছে জানেন আপনার বন্ধু সংকট বাবুর আগেই সন্দেহ হয়েছিল যে আপনার ওপর টেররিস্ট অ্যাটাক হতে পারে। আনফরচুনেটলি অ্যাটাকটা আপনার নাতির ওপর হল। তো যাই হোক আপনার সেফটির জন্য উনি আমাকে হায়ার করে ছিলেন। আমি বুঝতে পেরেছিলাম যে আপনার নাতির মাধ্যমে আপনার ওপর প্রেসার ক্রিয়েট করবে ওরা তাই রবিনকে ফলো করছিলাম।"
"এক্সেলেন্ট! তাই তো দারোগা সাহেব বললেন যে সান্টুও ওনাকে ফোন করেছিলো। সান্টু ওরে সান্টু ভাই আমার। তুই আমাকে এত ভালোবাসিস!" আবেগে গলার স্বর ধরে আসছে নুটু মুখুজ্জের। একলাফে সংকট চরণকে জাপটে জড়িয়ে ধরলেন। সংকট চরণও , " ওরে আমার নুটু বুকে আয় বলে জড়িয়ে ধরলেন বন্ধুকে।" দুই বন্ধুর সে আবেগঘন দৃশ্য দেখে যে কারুর চোখে জল এসে যাবে। জড়াজড়ি শেষ হতে কেলুদা বেশ কায়দা করে নিজের পিস্তলখানা তুলে নিয়ে সংকট চরণের কানে কানে ফিসফিস করে বললেন," বন্ধুর কাছে সত্য গোপন রেখে আপনার সংকট মোচন করার জন্য আমার ফি-টা কিন্তু ডাবল হয়ে গেল।" 


| Aleekpatamagazine.blogspot.in |
  |ALEEK PATA-The Expressive World |Online Magazine |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty |
| Special Lock-down Issue,2020 | April 2020 |হাসিরাশি সংখ্যা।
।নববর্ষ ১৪২৭| Third Year Fifth Issue |22nd Edition|
|© All Rights Reserved By The Editor and The Publisher |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |


 সূচি পত্র / Index














বড়গল্প-টেনশন -প্রতীক কুমার মুখার্জি


টেনশন
প্রতীক কুমার মুখার্জি
(লেখকের অনুমতিক্রমে পুনঃ প্রকাশিত)


অলঙ্করণঃ মিঠুন দাস

ক্যাম্পাসের মাঠে ক্রিকেট খেলছিল বুবলারা। স্টেট ব্যাংক অফ ইন্ডিয়ার বিশাল ক্যাম্পাসে কুড়িজনের দলটা মশগুল হয়ে ছিল খেলায়। হঠাত জিকো বলটা সপাটে তুলে মারতেই পিছনে ছুটল বুবলা - এটা ধরতেই হবে তাকে, নইলে এই বিচ্ছুদের টিমের ডাকাবুকো ক্যাপ্টেন  হিসেবে মান থাকবে না।
বলটা মাঠ পেরিয়ে সোজা উড়ে গেলো এস বি আই গেস্টহাউসের দিকে। ক্যাচ হবার সম্ভাবনা নেই, কারণ সেটা আগেই ওভার বাউন্ডারির গন্ডি পেরিয়ে গেছে। অগত্যা কেয়ারি করা পাতাবাহারের ঝোপের তলা থেকে বলটা খুঁজে মাঠের দিকে ছুড়তেই, গেস্ট হাউসের দরজা খোলার আওয়াজে বুবলা পিছন ফিরে তাকালো - এবং স্ট্যাচু হয়ে গেল সাথে সাথেই!
এ চেহারা যে ভোলার নয়। গেস্ট হাউস থেকে বেরিয়ে আসছেন আর কেউ না, স্বয়ং ভীষ্মদেব সামন্ত - সেই ছফুট লম্বা, টকটকে ফরসা, মুগুরভাঁজা বিশালবপু! সেই কাঁধ অব্দি লম্বা কাঁচাপাকা চুল (এখন পনিটেলে সজ্জিত) বিশাল গোঁফের সাথে মানানসই গালপাট্টা, প্রশস্ত কপালে সেই লাল টিপ ধকধক করে জ্বলছে! পরনে শুধু ঘিয়ে গরদের ধুতি আর উত্তরীয়র জায়গায় লিনেনের শার্ট ট্রাউজার্স, আর হাতে ভাঁজ করা ব্লেজার।
দরজায় তালা দিয়ে ঘুরেই তার দিকে তাকিয়ে একটা জিঘাংসালোলুপ হাসি, তারপর নারকীয় একখানা থাম্বস ডাউনের পর সেই বুড়ো আঙ্গুল নিজের গলায় আড়াআড়ি চালিয়ে দেওয়া ! অতএব তিনিই স্বয়ং! একসাথে মাথাটা ঘুরে উঠে পেটে মোচড় দিল বুবলার। শিরদাঁড়ার ভিতর দিয়ে নেমে যাওয়া শীতল স্রোতটা জানান দিল তার সামনে ভীষণ বিপদ।
ভদ্রলোক অবিশ্যি ইশারা করার পর বুবলাকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে, তর্জনীতে চাবি ঘুরিয়ে শিস দিতে দিতে মেনগেটের দিকে হাটা দিলেন। সম্বিত ফিরে পেতে বুবলা পায়ে পায়ে মাঠে ফিরে এসে ফিল্ডিং করতে শুরু করল। সে যে মোটেই শান্তিতে ছিলনা, সেটা বোঝা গেলো দু ওভার পরেই।
বিশ্বদুরন্ত ও নামকরা দুষ্টু, ক্যাম্পাসের দস্যিদলের অন্যতম মাথা বুবলা, ওরফে অন্তরীক্ষ সেন জীবনে প্রথমবার, মাঠে অসুস্থ বোধ করায়, বন্ধুদের কাঁধে ভর দিয়ে সি উইং এর লিফটে চড়ে অসময়ে ফ্ল্যাট অভিমুখে রওনা দিল। বাড়িতে ফিরতে বুবলার মা পড়ে গেলেন ফাঁপরে, কারণ তার তেরো বছরের ক্ষুদে দানবটির এ হেন করুণ অবস্থা দেখে ওনারা একেবারেই অভ্যস্ত নন।
সন্ধ্যেবেলায় বাবা অফিস থেকে ফিরে দেখেন ছেলে নেতিয়ে পড়েছে। তার মায়ের তো কাঁদোকাঁদো অবস্থা। হাজার প্রশ্নে জর্জরিত করে চলেছেন ছেলেকে, 'কেউ কিছু বলেছে?' 'কারু সাথে ঝগড়া হয়েছে?' 'বাইরে কিছু খেয়েছিস?' 'হঠাত পড়ে গেছিলি?' ‘মাথায় লেগেছে নাকি বলবি আমায়?’ ইত্যাদি ইত্যাদি। বুবলা চুপ - তার মুখ গম্ভীর, ভুরু দুখানি কুঞ্চিত, আর চোখদুটি চিন্তাক্লিষ্ট। স্ত্রীর ঝোলাঝুলিতে অগত্যা ডাক্তারবাবুর স্মরণাপণ্য  হতে হলো সেনবাবুকে।
তিনি এসে পরীক্ষা করে স্মার্ট হাসিতে বললেন, "এ এখন সবার হচ্ছে, হিট স্ট্রোক," দিয়ে ছাপমারা কাগজের উপর একগাদা ফরমায়েশ লিখে দিয়ে করকরে পাঁচশো টাকা পকেটতস্থ করে লিফটে ওঠার আগে সেনবাবুকে আলাদা করে ডেকে বললেন, "একটু শক তো পেয়েছে, তবে চিন্তার কিছু নেই, বাকি কথা রাতে হোয়াটস্যাপে হবে!"
সেনবাবু ফ্ল্যাটে ঢোকার আগে স্টেয়ারকেসের বিশাল জানলা দিয়ে নিজের অজান্তেই একবার বাইরে তাকালেন। এখান থেকে গেস্টহাউসের সামনেকার দিকটা পরিস্কার দেখা যায়। তার মুখে বিরল এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠেই মিলিয়ে গেল - আশেপাশে কেউ কোথাও আছে কিনা এক ঝলক দেখে নিয়েই তড়িঘড়ি তিনি ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়লেন।
আলাদা করে বলি। কে এই ভীষ্মদেব সামন্ত, কেনই বা আমাদের দাপুটে বুবলার তাকে দেখে আত্মারাম খাঁচাছাড়া হবার উপক্রম? তিনিই বা কেন প্রতিহিংসার হাসি আর খবরদারিতে বুবলাকে টেনশনে রোস্ট করে চলেছেন? বুবলার বাবা কেন এতো কিছুর পরও বেশ নির্লিপ্ত? ডাক্তারের সাথে তার হোয়াটস্যাপে কিসের কথা? কেনই বা তিনি গেস্টহাউসের দিকে তাকিয়েই নিজেকে সামলে নেন? কিছু বোঝা যাচ্ছে না, তাইতো?
ঠিক আছে, এখন আগস্টের মাঝামাঝি। সব জানতে হলে আমাদের একটু পিছিয়ে যেতে হবে - এই ধরো এপ্রিলের শেষের দিকটায়, গরমের ছুটির সময়টাতে। তার আগে বুবলাদের গ্রামের বাড়ির সম্বন্ধে বলে নিই একটু।
বুবলাদের আদি বাড়ি বর্ধমানের মেমারি গ্রামে। ওখানে এখনো তিনমহলা একখানা বাড়ি আছে ওদের। সেনবাবুরা তিন ভাইবোন, পালা করে নিজের নিজের সময়মত দেখাশোনা করেন সেই বাড়ির। পূজো, গরমের ছুটি আর শীতের সংক্ষিপ্ত ছুটিতে সবাই জমায়েত হয় ওইখানে। এমন কোনো ছুটি যায়না যখন বুবলারা গ্রামের বাড়ি যায়না ছুটি কাটাতে। এবং প্রতিবার সে কোনো না কোনো দুর্ধর্ষ কীর্তি রেখে আসে তাদের আদি গ্রামের বাড়িতে।
বুবলার ভাইবোন নেই, সে একা। কাকার এক মেয়ে, এক ছেলে, আর পিসির এক মেয়ে। তাদের এই দলে চারজনের ভিতর খুড়তুতো ভাইবোন এমনিতে শান্ত। কিন্তু পিসির মেয়ে আর বুবলা হল দুষ্টুমির ক্যাটালিস্ট। এই দুজনের উস্কানিতে বাকি দুজন ও নিমেষে নিজেদের ভাবমূর্তি ঝেড়ে ফেলতে পিছপা হয়না – হলেই যে প্রেস্টিজ ইস্যু। এদের ধুন্ধুমার কান্ডে গ্রামের মানুষ ত্রস্ত হয়ে থাকলেও, গ্রামতুতো স্নেহমায়ার বশে, সেভাবে কেউ মুখ খোলেনা। অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করতে করতে নিজেদের প্রবোধ দেয়, "আহা, মিষ্টি বাচ্চাগুলো। কদিন বই তো নয় - ফিরে গেলেই সব ঠিকঠাক আবার!"
সুতরাং অত্যাচার চলতে থাকে, উত্তরোত্তর বেড়ে চলে এই বোম্বেটে বাহিনীর বোমাবর্ষণ। বাবা মায়েরা প্রমাদ গুনতে থাকেন, গ্রামের লোকেদের ক্ষতিপূরণ দিয়ে হাতজোড় করতে থাকেন চুপিচুপি। কিন্তু দিনদিন তাদের চিন্তাও বাড়তে থাকে। বলা বাহুল্য, মুখ্য চিন্তাটা বুবলা আর তার পিসীর মেয়েকে নিয়ে - সব কিছুর মাস্টারমাইন্ড ওরা দুজন। এদের কিছু কাজের নমুনা দিলেই বুঝতে পারবে তোমরা, বানরবাহিনী বা পংগপালের চেয়ে কিছুমাত্র কম যায়না এদের হাতযশ।
গ্রামের প্রতিটা বাগানে একটি ফলও আস্ত থাকেনা - ঠিক আছে, ফল খাচ্ছ খাও, সমস্ত কাচা ফলগুলি পেড়ে ফেলে নষ্ট করার মানে কি? রয়েছে গুলতির কেরামতি, তা দিয়ে কখনো কারো ছাগল ভেড়া, নয়তো ছিপের ফাতনা লক্ষ্য করে টিপ করে মাছধরার বারোটা বাজানো, এগুলো সাধারণ। শান্তভাবে চলেফিরে বেড়ানো গরুমোষের ল্যাজ মুচড়ে দিয়ে সেগুলোর সাথে সাথে গ্রামের শান্তি নষ্ট করা, এ কোনদেশী ভদ্রতা বলতে পারো?
কাকতাড়ুয়ার মাথার হাড়ি, কলসী কুজো, কুকুর বিড়ালের ল্যাজে কোল্ড ড্রিঙ্কসের ক্যান বেধে দিয়ে সেগুলোকে টিপ করা, কিচ্ছু বাদ যায়না এই বিচ্ছুদের হাত, থুড়ি, গুলতি থেকে। পাড়াগাঁ অঞ্চল, অনেকে ভূতে অপদেবতায় ভয় পায়। ভর সন্ধ্যায় ফাকা জায়গা দেখে দল বেধে আপাদমস্তক সাদা থান জড়িয়ে হঠাত কাউকে ভয় পাওয়ানো, এসবেও পিছপা নয় এরা। কাকপাখিতে টেনে আনা আধখাওয়া ইঁদুর ইত্যাদি ফেলে রেখে আসে কারো তুলসীতলায়, কি নিকোনো উঠোনের মাঝবরাবর।
এর দাওয়ায় শুকোতে দেওয়া আচার, বড়ি বা আমসত্ত্ব চুরি করে অন্য বাড়িতে রেখে আসা, তারপর নিষ্পাপ মুখে জমিয়ে দুইবাড়ির ঝগড়া দেখতে যাওয়া, এসব ওদের কাছে নস্যি। আগের বছর কলকাতা থেকে একটা রবারের লাউডগা সাপ নিয়ে গিয়ে ভয় দেখাতে গিয়ে সে এক সাংঘাতিক কান্ড। আরেকটু হলে বিচ্ছিরি একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতো শীতলজেঠুর।
দুষ্টুমি ছোটবেলায় সকলে একটু আধটু করেই থাকে, কিন্তু এদের দুষ্টুমির ধরনটা ভালো নয়। ক্ষতিসাধনের একটা প্রছন্ন চেষ্টা আছে এতে। এই নিয়ে সবাই বড়ই উদ্বিগ্ন - সবাই ভাবতে থাকে কি করে এদের থামানো যায়, কারণ এরপর লোকে আর বাচ্চা বলে ছেড়ে কথা বলবেনা।
এতদিন ছুটিতে গ্রামজুড়ে লুঠতরাজ চালালেও, অজানা কারণবশত কিছু লোকের থেকে দূরে থাকত এই বিচ্ছুবাহিনী। যেমন কবিরাজ শ্যামাপদ পাকড়াশী মশাই এর ধারেকাছে ঘেঁষত না এরা। এই তালিকায় পড়তেন পঞ্চায়েত প্রধান পরিতোষ কর্মকার, পুরোহিত শিবতোষ গাংগুলী, আর অবশ্যই ভীষনদেহী ভীষ্মদেব সামন্তমশাই।
সামন্তরা ছিলেন এ গ্রামের জমিদার। জমিদারি গেছে, কিন্তু ঠাটবাট, দানধ্যান, আর আলগা চাকচিক্যের সাথে বিশাল চকমিলানো বাড়িটা, হরেকরকম গাছপালার বিশাল উদ্যানের সাথে তিনটে বিশাল বিশাল দিঘী সেই জমিদারীর প্রমাণ। বিশালদেহী ভীষ্মদেব আসলে সেনবাবুর বন্ধু, একইসাথে গ্রামের স্কুলে পড়াশোনা করেছেন, কিন্তু রাজাপ্রজায় একটা ব্যবধান রয়েই গেছে। বাড়ির মন্দিরে নিজে যখন পূজো করেন গরদের ধুতি উত্তরীয় গায়ে, কপালের লাল টিপ আর গুরুগম্ভীর কন্ঠস্বর শুনে বুক কেঁপে ওঠেনা এমন মানুষ খুব কমই আছে গ্রামে।
ভীষ্মদেব এদের কাণ্ডকারখানা সম্পর্কিত সব খবর রাখতেন, কিন্তু সেভাবে কিছু বলতেন না - হয়তো আত্মপ্রসাদ অনুভব করতেন এরা তাকে কোনোদিন আক্রমণ না করায়। এক দুবার সেনবাবুকে ডেকে বন্ধুর মতই বুঝিয়েছিলেন বাড়ির ছেলেদের বাগে আনার ব্যবস্থা করতে। আর সেটা কোনোভাবে শুনে ফেলে বুবলা। ব্যস, আর যাবে কোথায় – চ্যালেঞ্জ নিয়েই ফেলল বুবলা। ওনার তো কোনোদিন কোনো ক্ষতি করিনি আমরা? তাহলে আমাদের শাসন করতে বলবেন কেন উনি
তাই এইবার গরমের ছুটিতে গিয়ে অন্যান্য দুষ্টুমীর সাথে একটা জিনিস করার দুঃসাহস করেছিল বুবলা। ছোটখাটো অপারেশন অনেক হয়েছে, এবার সে টার্গেট করেছিল ওই দশাসই ভীষ্মদেবকেই। এবং ঠান্ডামাথায় প্ল্যান করে করেছিল কাজটা। 
ওরা ওনার পুকুরে, বাগানে, বাড়িতে কোথাও হাত দেয়নি, কারণ জানতো ওসব জায়গার নাগাল পাওয়া কঠিন। তাই, চুপচাপ নিজের মোবাইল ঘেটে এমন কাজ করেছিল, যাতে ছোটাছুটি না করেও সে দুষ্টুমীর ফল হল বিচ্ছিরীরকমের। আর ঠিক কলকাতায় ফিরে আসার দিনে কায়দা করে বিস্ফোরণটা ঘটিয়েছিল বুবলা এন্ড কোম্পানি, যাতে গ্রামে অশান্তি হলেও কেউ তার টিকি ছুতে না পারে।
ঘটনার দিন সকাল নটায় বিরাট একটা ট্রাক গ্রামে ঢোকার প্রধান রাস্তায় এসে থামল। এরপর ছোট রাস্তা, অতবড় গাড়ি আর ঢুকতে পারবেনা। ইউনিফর্ম পরা লোকজন নেমে এসে ভীষ্মদেবের ঠিকানা খুঁজতে, সবাই বাড়ি দেখিয়ে দিলো। লোক দুজন বাড়িতে এসে সামন্তমশাইকে বলল, "আপনার অর্ডারি মালপত্র এসে গেছে স্যার, রিক্সা ভ্যান বা গরুর গাড়ি পাঠাতে হবে, নিদেনপক্ষে ছোট গাড়ি, নইলে অত জিনিস আসবে কি করে? আর এই আপনার বিল, তিন লক্ষ একুশ হাজার। এটা সিওডি আছে, কার্ডে করবেন না ক্যাশে, স্যার?"
দেখেশুনে সামন্তমশাই এর গালে মাছি, শিবনেত্র অবস্থা!! বিলের শোভা বাড়াচ্ছে বেয়াল্লিশ ইঞ্চির টিভি, কম্বো মাল্টিপ্রসেসর ফ্রিজ, গাদাখানেক ব্র্যান্ডেড ফার্নিচার, দামী দু টনের চারটি এসি ইত্যাদি। ফরসা রঙ আস্তে আস্তে দুধেআলতা হতে শুরু করতেই ফোনটা বেজে উঠল ওনার - "মিস্টার ভি ডি সামন্ত? আপনার বাড়ি যাবার একটা ঠিকঠাক ল্যান্ডমার্ক বলুন তো! আমি এশিয়ান পেন্টস ইজিপেন্ট থেকে বলছি, আপনার বাড়িতে আজ থেকে কাজ শুরু। জব কার্ডে লেখা আছে আমরা এগারোটায় শুরু করবো।" ধপ করে শ্বেতপাথরের রোয়াকে বসে পড়লেন ভীষ্মদেব, চোখমুখ বিস্ফারিত। আর ঠিক সেই সময়েই সেনবাবুরা কলকাতা ফেরার জন্য বাড়ি থেকে বেরোলেন।
যখন সামন্তবাড়ি পেরোচ্ছে বুবলারা, তখন সেখানে ধুন্ধুমার কান্ড! আপাদমস্তক সিঁদুররাঙ্গা ভীষ্মদেব, বাজখাঁই গলায় প্রশ্নবাণ দেগে চলেছেন, "কিসের অর্ডার? কিসের বুকিং? কে করেছে? কলকাতা থেকে বুকিং হয়েছে? আমার কাছে স্মার্টফোনই নেই! এই অর্ডার কিভাবে আপনাদের কাছে গেছে তার আমি কি জানি?" ঘটনাটা ঘটছিল ঠিক সামন্তবাড়ীর সামনে রাস্তার উপর, আর সেটাই গ্রাম থেকে বেরোনোর একমাত্র প্রধান সড়ক। বুবলাদের গাড়ি ওখান দিয়ে পার হবার সময়েই তার মিচকে হাসিমুখটা তাঁর চোখে পড়ে গেলো – আর যায় কোথায়? পিছনে দেখা গেলো ছুটে আসছেন ভীষ্মদেব,"তুই করেছিস?এত সাহস তোর?আমি শেষ দেখে ছাড়বো। রোককে, রোককে!! জেলে গিয়ে পচবি তুই, আমি আসছি কলকাতায়। এর প্রতিশোধ আমি নেবো। গ্রামছাড়া করবো তোকে।"
গাড়ি চলার সাথে সাথে কথাগুলো মিলিয়ে যেতে বুবলা দেখলো মায়ের চোখে জল, আর বাবা কপাল টিপে ধরে বসে আছেন চুপ করে। সেই সময়েই উল্টোদিক থেকে আসা আরেকটা ট্রাক তাদের থামালো, "ভীষ্মদেব সামন্তের ঠিকানা বলতে পারবেন? ট্রাক ভরতি জামাকাপড়, ওনারই সমস্ত অর্ডার। একবার বাড়ি খুজে পেলেই ট্রাক খালি।" বুবলা গম্ভীরভাবে পিছনদিকে ফেলে আসা গ্রামটা দেখিয়ে দিতেই বাবার হাতের একটা বিরাশি সিক্কার চড় আছড়ে পড়ল তার গালে - প্রথমবার!!
এসব কথাই শুয়ে শুয়ে ভাবছিল বুবলা। সেই এপ্রিল মাসের ঘটনা, আর এটা আগস্ট - তিনমাস কেটে গেছে, সে ভেবেছিল ফাঁকা আওয়াজ। কিন্তু তিনমাস পরে লোকটা এসেছে, তাকে এক দেখাতেই চিনেছে, নিঃশব্দে শাসিয়েছেও। তাহলে এবার কি হবে - সত্যি সত্যিই কি তাকে জেলের ঘানি টানতে যেতে হবে? সে শুনেছে, অল্পবয়সী অপরাধীদের আলাদা জেল আছে। আবার গা পাক দিয়ে উঠল বুবলার।
সেদিন অনেক রাতে ঘুম এলো বুবলার, মাঝে মাঝেই চমকে উঠে বসছিল সে। পরদিন সকালে উঠেই বারান্দায় ছুটে গেলো, সম্ভবত কালকের ব্যাপারটার সত্যাসত্য যাচাই করার জন্য। গেস্টহাউসে তালা দেখে সে যারপরনাই খুশি হয়ে রেলিঙে ভর দিয়েই আঁতকে উঠে পিছিয়ে এলো। ব্যালকনির ঠিক নিচে দাঁড়িয়ে ভীষ্মদেব সামন্ত, তার দিকে আঙ্গুল তাক করে হাতের মুদ্রায় বন্দুক চালিয়েই তাদের লিফটের দিকে এগোতে লাগলেন তিনি। বুবলা শিউরে উঠে ছুটে গিয়ে বাথরুমে দরজা দিলো।
কিন্তু পনেরো মিনিট কেটে গেলো, তাদের বাড়িতে কেউ বেল বাজালো না দেখে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এসে সোজা নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল ডানপিটে বুবলা। কিছুক্ষণ পরে তার মা গিয়ে দেখলেন তার রীতিমত কম্প দিয়ে জ্বর এসেছে। সেদিন স্কুল যাওয়া বন্ধ হল ছেলের। কিছুক্ষণ পর পরই বুবলা জানলার ফাক দিয়ে, কখনো পর্দা সরিয়ে, বা ব্যালকনি থেকে উঁকি দিতে লাগলো – লক্ষ্য গেস্টহাউস। কিন্তু ‘নো সাইন অফ সামন্ত!’ লোকটা গেলো কই? পুলিশের কাছে তার নামে নালিশ করতে নয়তো?
বিকেলে খেলতে নামছিল না বুবলা, কিন্তু বন্ধুরা ডাকাডাকি করতে বুকে বল পেলো সে। মা লক্ষ্য করলেন প্রথমবার, ছেলেকে একটু অন্যরকম লাগছে ! অন্যদিনের মতো ‘ডোন্ট কেয়ার’ ভাব টা যেন জলে ভেজানো মুড়ির মতোই নরমের দিকে! ‘আমার একমাত্র ছেলেটার মাথাটা ঠান্ডা করে দাও ঠাকুর, আমি কামাখ্যার মন্দিরে তোমায় গয়না...’ এই অব্দি ভাবতে ভাবতেই দরজায় প্রবল ধাক্কার সাথে ডোরবেলের আওয়াজে ছুটে গেলেন তিনি।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছে বুবলা – দরদরিয়ে ঘামছে সে। ‘কি হয়েছে বাবা, ফিরে এলি কেন?? শরীর খারাপ করছে? কি হয়েছে বল আমায়?’ দুরন্ত বুবলা আর কিছু না বলে মায়ের হাতে একটা লাল গোলাপ গুঁজে দিয়ে ফোঁপাতে ফোঁপাতে মায়ের বুকে মুখ ঢাকল। পরে সন্ধ্যেবেলায় বাবা বাড়ি ফেরার পর সে জানালো বিকেলে মাঠে যেতেই গেস্টহাউসের লোকটা হন-হনিয়ে এসে বুবলার হাতে ফুলটা ধরিয়ে দিয়ে একটা ‘থাম্বস আপ’ দেখিয়ে হা হা করে হাসতে হাসতে গেস্টহাউসের দিকে ফিরে যায়।
বাবা সব শুনে যেন আমলই দিলেন না, বললেন, ‘তোর মত দানবকে যদি কোনো ভদ্রলোক ফুল দিয়ে থাকেন তিনি নিশ্চয় ভুল করেছেন, তারই উচিত ডাক ছেড়ে কাঁদা।‘ তখন বুবলা আসল কথাটা বলল, ‘বাবা, লোকটা আর কেউ না, আমাদের গ্রামের সামন্তকাকু!’ বাবা বললেন, ‘হতেই পারেনা, ভীষ্মদেব গ্রাম ছেড়ে এভাবে বেরোতেই পারেনা, দাঁড়া, তাও আমি গ্রামে ফোন করে খোঁজ নিচ্ছি।‘ কিন্তু গ্রামে ফোন করে দেখা গেলো সত্যিই ভীষ্মদেব গ্রামে নেই, বাইরে কোথাও গেছেন। অবশ্য কোথায় গেছেন সে ব্যাপারে কেউ বলতে পারলোনা।
পরের তিনটে দিন বুবলার তেরো বছরের জীবনে সবচেয়ে অন্ধকার দিন হিসেবে গণ্য হয়ে থাকলো। বিভিন্ন সময়ে নানাভাবে ক্যাম্পাস সংলগ্ন সমস্ত জায়গা থেকে নানাভাবে নিঃশব্দে আমাদের তুখোড় বুবলাকে টেনশনে জর্জরিত করে তুললেন ভদ্রলোক। কিন্তু ওই পর্যন্তই, তার বেশি কিছু ঘটলো না – একটা কথাও উনি বলেননি। কিন্তু তার নিজের করে আসা অনাসৃষ্টি ও তার ফলে অগ্নিশর্মা সামন্তকাকুর মুখ থেকে বেরোনো প্রতিটা শব্দ মনে পড়তে লাগলো বুবলার, মনে করালেন গেস্টহাউসের অতিথি। বাবা মা দু তিনবার গেস্টহাউসে গেলেন বটে দায়সারা, কিন্তু দেখা হলোনা ভীষ্মদেবের সাথে।
শেষে মরিয়া বুবলা পুলিশকে ফোন করার কথা ভেবেও হাত গুটিয়ে নিলো। সে ভাবলো, পুলিশ যদি আসে, তাহলে সব শুনে তাকেই ধরবে, কারণ সত্যি কথা, আজ অব্দি সামন্তকাকু তার এতটুকু অনিষ্ট করেননি। এতদিন যা অনিষ্ট করার সে করেছে। ভিতরে ভিতরে কোথায় যেন তার মধ্যে একটা পরিবর্তন আসছে। সে নিজের অবস্থা দেখে আগে তার করা সমস্ত দুষ্টুমির জন্য আক্ষেপ করতে শুরু করেছে!
চারদিন চলার পর আর পারলোনা বুবলা। বাবা মায়ের সামনে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে সমস্ত দোষ স্বীকার করে তাঁদের পা ছুয়ে প্রতিজ্ঞা করলো যে আর কখনো সে দুষ্টুমি করবেনা। মায়েরা নরম মনের মানুষ, সেই বিধি মেনেই যেন মা তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বাবা বললেন, ‘নে, এবার নিজে ফোন করে সামন্তকাকুর কাছে ক্ষমা চাইবি, আমি ডায়াল করছি…’ কথা শেষ হতে না হতেই বুবলা লাফ দিয়ে উঠে বলল, ‘ফোনের কি দরকার, আমি এক্ষুনি গিয়ে কাকুর সাথে সব সেটল করে ফেলছি!’ বলে তিন লাফে বেরিয়ে গেলো ফ্ল্যাট থেকে।
এবার সেনবাবু হতভম্ব ভাবে স্ত্রীর দিকে চেয়ে হাত উল্টে, ‘যাচ্চলে, এবার সামলাবো কি করে?’ বলেই দেখেন, তাঁর স্ত্রী তাঁর দিকে চোখ পাকিয়ে বসে আছেন। ঝামেলা হবার আগেই সেনবাবু বললেন, ‘শোনো, যা করেছি তাতে হয়তো তোমার গোপালের একটু কষ্ট হয়েছে, না করলে ও বজ্রংবলী হয়ে দেশবিদেশে ল্যাজের আগুন ছড়িয়ে বেড়াতো। তোমার ছেলে আর কোনদিন দুষ্টুমি করলেও, বদমায়েসী করবেনা, আমার গ্যারেন্টী রইল। এবার তাড়াতাড়ি গেস্টহাউসে চলো। এই অবস্থায় তাকে কি করতে হবে, সহদেব মোটেই জানেনা।‘
গেস্টহাউসের অবস্থা তখন মারাত্মক! ওই বিশাল চেহারায় কালো একটা জিম ভেস্ট আর লিওটারড পরে নাকিসুরে বিশুদ্ধ মার্কিনীতে পরিত্রাহি চিৎকার করে চলেছেন ভীষ্মদেব, থুড়ি সহদেব সামন্ত, ‘হে বয়, প্লীজ লিভ মি। হোয়াট অন আর্থ! লেট মি গো! লেট গো মাই লেগস – আই গন্না ফল!!’ কিন্তু কে শোনে কার কথা? অতবড় চেহারার লোকটির পা ধরে ঝুলে আছে বুবলা – দেখে মনে হচ্ছে যেন গোল্ডেন বীকড কিং ঈগল পায়ে করে ছোট্ট একটা মাছ ধরে নিয়ে যাচ্ছে !!
অনেক কষ্টে দুজনকে ছাড়ানো গেলে, গেস্টহাউসে তালা দিয়ে সবাই ফিরে এলো বুবলাদের ফ্ল্যাটে। সেখানে বসেই জানা গেলো যে গেস্টহাউসের অতিথি মোটেই ভীষ্মদেব সামন্ত নন, ইনি তার যমজ ভাই সহদেব সামন্ত, আমেরিকাবাসী কুড়ি বছর যাবত। প্রতিবছর দেশের বাড়িতে এসে পনেরো বিশদিন থেকে যান। আর এই পুরো প্ল্যান টা বেরিয়েছে সেনবাবু আর ভীষ্মদেবের মাথা থেকে। ঠিক করেছিলেন, বুবলার বুদ্ধিমত্ত্বার কাঁটা ওনারা বুদ্ধিমত্ত্বার দ্বারাই তুলবেন – ছুটিতে পাকানো অশান্তির শোধ নেবেন ছেলেটাকে টেনশনে ছুটোছুটি করিয়ে! বুবলা এবং তার মায়ের এই যমজের ব্যাপারটা জানা না থাকায় প্ল্যান করতে কোনো অসুবিধাই হয়নি!
সব জানার পর প্রবল হাসাহাসির ভিতর একটা ফোঁপানোর আওয়াজে সবাই দেখলো বুবলা হাপুস নয়নে কেঁদে চলেছে।  আজ কেউ তাকে বাধা দিলো না, শুধু সহদেব তার পকেট থেকে একটা দামী ডিজিটাল ক্যামেরা বাড়িয়ে ধরে বলল, ’ফ্রম টুডে দিস ইস ইওয়স, জাস্ট ডিলিট দ্য স্ন্যাপস আই টুক টু কিপ এন আই অন ইউ, মিস্টার ডেনিস!’ মার্কিনী মানুষ তো, ওদের কাছে ডেনিস হলো দুষ্টুমীর ইউনিট!
বুবলাই ঠিক করল পরেরদিন সবাই মিলে গ্রামে যাবে, প্রথমে ভীষ্মদেবকাকু, তারপর সমগ্র গ্রামবাসীর কাছে ক্ষমা চাইবে সে। তার বাবা এটা জানিয়ে সামন্তকাকুকে ফোন করার কথা বলতে গেলে বুবলা বারণ করে, ‘সারপ্রাইজ দিয়ে শুরু হয়েছিল, সারপ্রাইজ দিয়েই শেষ হোক!’
পরদিন গাড়িতে সামনের সীটে বসা সহদেবকাকুকে জিগ্যেস করলো বুবলা, ‘আই ডিড দ্য মিসচীফ ইন এপ্রিল, হোয়াট টুক ইউ সো লং?’ এক গাল হেসে চকচকে সদ্য কামানো গালে হাত বুলিয়ে জবাব দিলেন ছোট সামন্ত, ‘ইট টুক লং টু গ্রো সাচ ম্যামথ হুইস্কারস টু লুক লাইক ভীষ্মা !!’
মা পিছনের সীট থেকে অবাক হয়ে তাকাতে বাবা বুঝিয়ে দিলেন, ‘আরে আমেরিকার অফিসে তো ওরকম বুনো রাক্ষসের মত গোঁফদাড়ি রাখতে দেয়না!’
‘আরেকটা প্রশ্ন বাবাকে,’ গম্ভীর মুখ বুবলার, ‘ডাক্তারবাবুর সাথে হোয়াটস্যাপে কি কথা হতো তোমার?’ সেনবাবু বললেন, ‘সে অনেক কথা বাবা, যতটা শক তুমি লোককে দিতে, তার কতটা তোমার শরীর নিতে পারে তার হিসেবপত্র করতাম আমরা। বড় হয়ে বাবা হও, সব হাড়ে হাড়ে বুঝবে!’
হাসির রোল উঠিলো, গাড়ী সবেগে ‘ছুটির ডেস্টিনেশন’ এর দিকে ‘ছুটিতে’ লাগিলো।।

এই গল্পের চিন্তাধারা সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। কোন জীবিত অথবা মৃত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কোনরূপ কর্মকাণ্ডের সাথে যদি এই গল্পের কোন ঘটনার মিল থেকে থাকে, তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় ও অনিচ্ছাকৃত।



| Aleekpatamagazine.blogspot.in |
  |ALEEK PATA-The Expressive World |Online Magazine |
| Editor: Swarup Chakraborty | Publisher: Debasree Chakraborty |
| Special Lock-down Issue,2020 | April 2020 |হাসিরাশি সংখ্যা।
।নববর্ষ ১৪২৭| Third Year Fifth Issue |22nd Edition|
|© All Rights Reserved By The Editor and The Publisher |
|a DISHA-The Dreamer Initiative |


 সূচি পত্র / Index














Main Menu Bar



অলীকপাতার শারদ সংখ্যা ১৪২৯ প্রকাশিত, পড়তে ক্লিক করুন "Current Issue" ট্যাব টিতে , সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা

Signature Video



অলীকপাতার সংখ্যা পড়ার জন্য ক্লিক করুন 'Current Issue' Tab এ, পুরাতন সংখ্যা পড়ার জন্য 'লাইব্রেরী' ট্যাব ক্লিক করুন। লেখা পাঠান aleekpata@gmail.com এই ঠিকানায়, অকারণেও প্রশ্ন করতে পারেন responsealeekpata@gmail.com এই ঠিকানায় অথবা আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

অলীক পাতায় লেখা পাঠান