অলীক পাতার অন্যান্য সংখ্যা- পড়তে হলে ক্লিক করুন Library ট্যাব টি



। । "অলীক পাতা শারদ সংখ্যা ১৪৩১ আসছে এই মহালয়াতে। । লেখা পাঠানোর শেষ তারিখ ১৫ ই আগস্ট রাত ১২ টা ।.."বিশদে জানতে ক্লিক করুন " Notice Board ট্যাব টিতে"

Sunday, June 3, 2018

যখন তখন-ভ্রমণ-স্বরূপ কৃষ্ণ চক্রবর্তী (৩)

ইউরোপ ভ্রমণ -পর্ব ৩


স্বরূপ কৃষ্ণ চক্রবর্তী

সংখ্যা -৯, (৩রা জুন,২০১৮)





রাত্রে ঘুমোতে যাবার আগে তার ম্যানেজারের কল টাইম ব্রেকফাস্টের জন্য সকাল সাড়ে সাত টা, মাথায় ঢুকিয়ে ঘুমোতে গেছি আর ক্লান্ত থাকার জন্য বিন্দাস ঘুমিয়েছি। কিন্তু সকালে তো উঠেই আবার সেই প্লাস্টিক গ্লাসের খোঁজ শুরু করার আগেই বাঙালি পেটে একটু গরম তরল না পড়লে যে ঘটনা ঘটবে না তা বাঙালি মাত্রই জানে। অতএব ঘরের মধ্যেই চায়ের বন্দোবস্ত। সাথে ছিল টি ব্যাগ আর হোটেলেও দিয়েছিল। অবশ্য ইউরোপ এ সব হোটেল এ কিন্তু কেটলি আর চা রুমে দেয়না। আমরা সেটাতেও তৈরি ছিলাম। সাথে যাত্রা র দেয়া উপহার ইলেক্ট্রিক কেটলিও ছিল। একটা কথা। সাথে থাকলেও ইউরোপিয়ান দেশের প্লাগের জন্য এটাচমেন্ট না থাকলে সব ফক্কা।  জানাবার জন্য বলি যে যদি কেটলি না থাকে বা হোটেল থেকে না দেয় ঘাবড়াবার কিস্সুটি নেই। পুরো ইউরোপে সবখানে জল এতটাই ভালো যে সবাই ডিরেক্ট ট্যাপ থেকেই জল খায়। তাই হট ওয়াটার ট্যাপ থেকে নিয়ে টি ব্যাগ দিলেই চা তৈরি। 
চা খেয়েই সেই প্লাস্টিক গ্লাস বগলে নিয়ে ঢুকে পড়লাম আর একদম গরম জলে স্নান করে বাইরে বের হলাম একের পর এক। কারণ সাড়ে সাত টা। ব্রেকফাস্ট। সেজে গুজে সারাদিনের জন্য পিঠের রুকস্যাক ঝুলিয়ে খাবার হলে গিয়ে শুরু করলাম ডান হাতের কাজ। জম্পেশ করে ব্রেকফাস্ট করলাম। আরেকটু হলেই পা পিছলে যেত। আমি সসেজ খুব ভালোবাসি। ঢাকনা খুলেই চেহারা দেখে সন্দেহ হওয়াতে গোরি ডাচ ওয়েট্রেস কে জিজ্ঞেস করতেই বললো যে সেটা চিকেন সসেজ নয়। বিফ সসেজ। সেই তখন থেকে আমি ১০ দিন ব্রেকফাস্ট আর লাঞ্চের সময় সসেজ খাইনি।  
ব্রেকফাস্ট টা জম্পেশ করে খাবার কারণ হচ্ছে যে লাঞ্চের খাবার গুলো ঠিক বাঙালি মুখে রোচে না। আর জায়গার ও ঠিক থাকেনা। বেশির ভাগ সময়েই অটো গ্রিল এ খেতে হতো। আর ডিনার সেই দিন মানে সন্ধে বেলা সাতটার সময় খেতে হবে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয়। পুরো দিনের আলোয় আমরা ডিনার করতাম। রাত তো হবে পৌনে দশটায়।

গিয়ে বসলাম আমাদের প্লেনের মতো আমাদের বাসে। আজকে যাবো keukonhof বলে এক জায়গায়। টিউলিপ ফুলের বাগানে। তারপর আমস্টারডাম শহর এর দর্শনীয় জায়গা যেরকম Dam square, Rembrandt wooden shoe and cheese factory . তারপর শহরের মাঝখান দিয়ে ক্যানাল এর ভেতরে ক্রুজে সফর। অনেক পুরোনো শহর। সমুদ্রের সাথেও যুক্ত। ভীষণ পরিষ্কার। একটুকরো নোংরা নেই কোথাও। অসংখ্য ক্যানালে ভর্তি। সব একে অপরের সাথে যুক্ত। 
গিয়ে পৌঁছুলাম keukonhof  এ। কত লোকরে বাবা! পৃথিবীর কত্ত দেশ থেকে এসেছে সব। মেলার মতো ভিড়। মনে হচ্ছে এক ইডেন ভর্তি লোক সব হাজির হয়েছে। তবে দেখার মতোই টিউলিপ বাগান। অসাধারণ অভিজ্ঞতা। 
আমাদের ইরানি জি মানে ট্যুর ম্যানেজার সবাইকে নিয়ে সুসংবদ্ধ ভাবে টিকিট কেটে ঢুকিয়ে দিয়ে বাসে ফেরার সময় ঘোষণা করে দিলেন। আর আমরা ছাড়া গরুর মতো ঢুকে পড়লাম ছবি তুলতে তুলতে। ছবি নীচে দিচ্ছি। ভেতরে ঢুকে যেদিকে তাকাই শুধু টিউলিপ আর টিউলিপ। কত ধরনের কত রঙের। কি বাহার আর ওদের ফুলের যত্ন কি! যেন ফুলগুলো মানুষের বাচ্চা। 
দেখলাম ইউরোপিয়ানরা বাঁচতে জানে। আমরা যেখানে রিটায়ার করলেই বাতিলের দলে চলে যাই বাড়ির লোকেদের বা পাড়া পড়শীর চোখে ওখানে তা নয়। আমি নিজেই প্রায় ১০০ এর বেশি হুইলচেয়ারে বয়স্কদের দেখেছি যেখানে স্ত্রী স্বামীকে বা স্বামী স্ত্রীকে হুইল চেয়ারে নিয়ে ঠেলে নিয়ে চলেছে ফুল দেখাতে মুখে হাসি নিয়ে। এমনকি বাগানের মধ্যে দেখলাম যে মেকানাইজড স্ট্রেচারে করে একজন বয়ষ্কাকে চারজন বয়স্ক মানুষ ঠেলে নিয়ে চলেছেন চাকা লাগানো স্ট্রেচারে ঠেলে ঠেলে। আর উনি শুয়ে শুয়েই দেখছেন। সাথে ওনার সাথীরা বর্ণনাও করে চলেছেন।
ফুল দেখা ও ছবি তোলা শেষ হলো একসময়। মনে অসাধারণ খুশি নিয়ে বাসে গিয়ে নির্ধারিত সময়ে বসলাম। 
"আহা কি দেখিলাম, জন্ম জন্মান্তরেও ভুলিব না" এটা লেখার ইচ্ছা সংবরন করতে পারলাম না।
তারপর সেই সাবেক কালের উইন্ডমিল দেখতে চললাম। কি বিশাল আর কি অদ্ভুত বেসিক মেকানিজম। আমার দেখে তাক লেগে গেলো। ছবি তোলা হলো, নীচে দিলাম। 
এবার শুরু হলো সেই চিজ ফ্যাক্টরি যাওয়া। রাস্তার দুধারে কত নাম জানা গাছ, বেশিরভাগই ফুলে ভর্তি। রাস্তা এত মসৃন যে বলার অপেক্ষা রাখেনা। বাসে বসে কেউ সূঁচে সুতো পড়াতে চাইলেও পারবে। কাঠের জুতো তৈরির কারখানা দেখলাম। কিভাবে তৈরি হয় সেটাও দেখলাম। গোটা একেক খণ্ড কাঠ থেকে মেশিন দিয়ে পা ঢোকানো জুতো তৈরি হচ্ছে। সুন্দর সব রং করা। দেখলে অবাক হতে হয়। অবশ্য ওগুলোর বাস্তবিক ব্যবহার কতোটা আমি জানিনা। হয়তো স্মারক হিসাবেই থাকে আজকাল। সে যাকগে। 


তারপর হাতে বানাবার চিজ ফ্যাক্টরি। দারুন ভাবে মেশিন দিয়ে হাতে করে চিজ বানিয়েছে। মেশিন দিয়ে হাতে করে মানে কিন্তু সোনার পাথরবাটি নয় । সত্যি বেশ মজার। মেশিনটা একদম সহজ মানে আগে যেভাবে ষোড়শ সপ্তদশ শতাব্দীতে বানানো হয় সেইভাবে মেশিনটা তৈরি করা। চিজ গুলো হাতে নিয়ে দেখলাম ইঁটের মতো শক্ত। বিনা ফ্রিজে বাইরে রাখা যায় মাসের পর মাস। শীতের দেশ তো, ট্রপিক্যাল দেশ হলে মজাটা টের পেতো। যে গরুর দুধ থেকে তৈরি হয় সেগুলোও দেখলাম। কি সব হৃষ্টপুষ্ট গরু একেকটা।
যথারীতি সব কিছু দেখবার পরে কিছু চিজ কেনা হলো আর সাথে কিছু স্মৃতি চিহ্ন। দাম দিলাম সেই ফরেক্স কার্ডে আর যথারীতি ওটার তাপমাত্রা কমতে থাকলো।
একটা কথা বলে দেই এখানে, যারা ধূমপায়ী তারা দেশ থেকেই সিগারেট কিনে নিয়ে যাবেন সীমার মধ্যে। কারণ ওখানে সিগারেটের দাম ইন্ডিয়ান টাকাতে অনেক বেশি। তবে বিদেশি সিগারেটের ইচ্ছে থাকলে ওখানেও কিনতে পারেন। আমাদের মতো অলিতে গলিতে কিন্তু দোকান পাবেন না। হয় টোব্যাকো শপ নতুবা সুপারমার্কেট। 
আরেকটা কথা, অপ্রাসঙ্গিক কিনা জানিনা তবু সবার জন্য বলা কর্তব্য মনে করছি।এখানে পাবলিক ইউরিন্যাল খুব কম । যা আছে সব বড় দোকানে বা রেস্তোরাঁয়। কিন্তু যদি আপনি পাবলিক ইউরিন্যাল এ যান ৫০/৮০ ইউরোসেন্ট খরচ করতে হবে। যার ইন্ডিয়ান সমসাময়িক মূল্য প্রায় ৪৫ থেকে ৬৮ টাকার মধ্যে। এটা জন প্রতি খরচা। তবে ইউরিন্যাল বা টয়লেট গুলো অসাধারণ পরিষ্কার এবং স্বাস্থ্যসম্মত। সেজন্যই মনে হয় ইরানিজি আমাদের বলেছিলেন জল সিপ করতে ঢকঢক করে খেতে মানা করেছিলেন। তাও কয়েকবার দুজনে আমরা ১০০ টাকার উপরে খরচ করে ওয়াশরুমে গেছি। আরেকটা মজার ব্যাপার অটো-গ্রিল এর খাবার ওরকম হওয়া সত্ত্বেও আমরা যখন নামতাম , বাস ভর্তি লোক দৌড়িয়ে যেত ওয়াশ রুমের দিকে, কারণ ওটা ফ্রী। যাক এবার আলাদা কথা। মূল কাহিনীতে ফিরি।
তারপর চললাম ক্যানাল ক্রুজের জন্য। এত সুন্দর প্রফেশনাল ভাবে সব কিছু ম্যানেজড যে আমার ভারতীয় সত্তা হাঁকডাক না দেখে হাঁফিয়ে উঠছিল। 
সত্যি, আমাদের এখনো ওদের কাছে অনেক কিছু শেখার আছে। জানি, আমাদের মূল সমস্যা জনসংখ্যা। তবুও রীতিনীতি আর নিয়মানুবর্তিতা বা অভ্যেস একটা জাতিকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে সেটা আমার এই ভ্রমণ চোখ খুলে দিয়েছে। যেদিকে দেখি সবুজ আর সবুজ। পরিষ্কার সবকিছু। রাস্তার পাশেও ধুলো নেই। সাইকেল আরোহীদের আলাদা লেন। আর সিগনাল যেন লক্ষনরেখা। সাইকেল আরোহিরাও মানে। জেব্রা ক্রসিং আর সিগনাল ছাড়া কেউ রাস্তা ক্রস করে না। আর চাষের জমি, আদিগন্ত হরিয়ালি। সব মেকানাইজড। পুরো জমিতে কোনো আল( জমির ভাগ চিহ্ন) নেই। কয়েকশ একরের পরে আবার আলাদা জমি। সব তারের জাল দিয়ে ঘেরা। যদিও কোনো ছাড়া পশু আমি দেখতে পাইনি । যেরকম দেখতে পাইনি রাস্তার কুকুর। কাক দেখবার জন্য প্রাণ আনচান করছিল। শেষে মাউন্ট টিটলিস এ গিয়ে দেখে আমার কি আনন্দ। গিন্নি বলেই ফেললেন যে জীবনে প্রথম কাক দেখলাম মনে হচ্ছে। সে আলাদা গল্প। 
সুন্দর একটা ক্রুজে বসলাম বাসভর্তি সবাই। ক্যানাল দিয়ে চলেছি আর দেখছি সাথে ইরানিজি ছিলেন হিন্দি ও ইংরেজিতে বলে যাচ্ছিলেন কোনটা কি কবেকার ইত্যাদি ইত্যাদি। ষোড়শ, সপ্তদশ, অষ্টাদশ শতাব্দীর প্রাচীন বাড়ি গুলো দেখে অভিভূত হয়ে যাচ্ছিলাম। কি সুন্দর কত যত্নে ওগুলোর রক্ষণাবেক্ষণ করা হয়। আজও ঝকঝকে তকতকে। এখনো সেগুলোতে মানুষ বসবাস করে। দেখলে মনে হয় কিছুদিন আগেই রং করা হয়েছে। অনেক ছবি তুললাম। কিছু ভিডিও করলাম, কিন্তু সব দেখতে পারছি না এখানে টেকনিক্যাল কারণে।
আরেকটা জিনিস চোখে পড়লো। ইউরোপে যেখানে যেখানে গেছি সব জায়গায় রাইট হ্যান্ড ড্রাইভ গাড়ির। আর সবাই এত সিগনাল মানে যে রাস্তা খালি থাকলেও কেউ ক্রস করবে না। হর্নের শব্দ শুনতেই পাইনি। সন্দেহ হচ্ছিল যে গাড়িতে হর্ন আছে কিনা। সবাই লেন ড্রাইভিং করে। আর ভুল করেও যদি আমাদের মতো বা আলাদা কোনো নন ইউরোপিয়ান সিগনাল না খেয়াল করে রাস্তা ক্রস করে গাড়িগুলো দাঁড়িয়ে গিয়ে হাত দিয়ে হাসিমুখে ইশারা করে পেরিয়ে যেতে। পথচারীর অবিমৃষ্যকারীতে রেগে যায়না। 

অবশ্য আমরা সেরকম করিনি কারণ yatra খুব ভালো ব্রিফ পাঠিয়েছিল , গুগল দাদা ও ইরানিজি ও খুব ভালো করে বুঝিয়ে দিয়েছিল। সব দেখা শেষ হলে ঘড়িতে সাত তা বাজবার উপক্রম হতে সূর্যের তোয়াক্কা না করে ডিনারের জন্য চললাম ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁয়। সত্যি বলছি সূর্যের এতবড় হতছেদদা আমি দেখিনি, আকাশে আমাদের ২/৩ টের মতো সূর্য আকাশে জ্বলজ্বল করছে আর আমরা ডিনার করছি। কি আজব তাই না?
অবশেষে ডিনারান্তে সবাই হোটেল, দেড়ফুটিয়া গদি আর শয়নে পদ্মনাভঞ্চ করা আগামীকালের ভোরের জন্য।
আজ এই পর্যন্তই থাক। আবার আসছি দিন তিনেক পরে গ্রুপের নিয়ম মেনে।


 ভালোলাগা বা মন্দলাগা জানাতে ভুলবেন না কিন্তু। তাহলে আগামীতে সংকোচন বা বিবর্ধনের কথা ভেবে দেখবো।
 ক্রমশঃ

সমস্ত ছবি লেখকের নিজের তোলা





পড়ুন আগের পর্ব                                                                                                  পড়ুন পরেরপর্ব 






Friday, June 1, 2018

যখন তখন-কবিতা-শুভদীপ ঘোষ


বর্ষার ধারা

শুভদীপ ঘোষ
সংখ্যা -৮ (২ রা জুন,২০১৮)


ঝিরি ঝিরি বহিছে বাতাস,মাতিছে বাদল স্বপন খেলায়,
কি করে থাকি বসে গৃহে এই সাঁঝের বেলায়।।
উঠিছে হুঙ্কার ক্ষণে ক্ষণে,
যাচ্ছে উড়ি বারিদ সব কোন দেশের পানে?
ভিজিছে আজ বিহগ গুলি,উড়িছে তারা সানন্দে;
মাতিছে তাদেরও মন এই মধুর বর্ষার প্রারম্ভে।।
মহীরুহ সব আজ পাহিছে স্বস্তি,পুড়িছে তারা বহু বেলা,
আজ যেন বর্ষার ছুঁতে তারা করিছে খেলা।।
পিপাসিত চাতকটি নিয়েছে আজ শ্বাস,পাহিছে জল-
তারাও আজ জোট মিলিয়ে পাড়িছে কোলাহল।।
সবুজ ঘাসে ছেলেরা করিছে খেলা,বারি কণা সব পাতিছে মেলা;
গৃহে শুধু বসে আছি আমি একেলা।।
চঞ্চলময় আমারও মন,মাতিছে সেও বর্ষার তালে-
ধরেছি তারে হাতের মুঠোয় মেখেছি কপোলে।।
আমিও যদি উড়িতে পারিতাম,ভাসিতাম আকাশে;
ঘুরিয়া বেড়াতাম দেশ বিদেশ,ঝরে পড়িতাম বর্ষার নিঃশ্বাসে।।
মুগ্ধ আমি রঙের খেলায়,সাদা কালোর অটল গড়নে;
ঝলকে ওঠে বিজলী জ্বেলে দেয় দীপ বকুল কাননে।।
দক্ষিণ হতে আসিছে আরো কাল মেঘ,গর্জে ওঠে ধরণী;
চলিছে তার নৃত্য লীলা,নামিল রজনী।।
জানিনা থামিবে কখন এই মধুর লীলা?
দেখিতে দেখিতে আমার পোহাল বেলা।।




















যখন তখন-ভ্রমণ (২)-স্বরূপ কৃষ্ণ চক্রবর্তী


ইউরোপ ভ্রমণ -পর্ব ২


স্বরূপ কৃষ্ণ চক্রবর্তী

সংখ্যা -৭, (১লা জুন,২০১৮)


আবুধাবি তে পৌঁছে তো বেশ লাগছিলো যে UAE র এত্ত নাম শুনেছি. এখন সেখানে পৌঁছে গেছি। কিন্তু একি আকাশযান মাটিতে নামবার পরেও তো আমাদের নামতে দিচ্ছে না প্লেন থেকে। দেখি প্লেন মোটর গাড়ির মত ট্যাক্সিইং করেই চলেছে। কত্ত বড় এয়ারপোর্ট রে বাবা! দেশের মোটামুটি সব বড় এয়ারপোর্ট সাথে কিছু ছোট এয়ারপোর্ট ও ঘোরা হয়ে গেছে কিন্তু মাটি ছোঁয়ার পরেও এতক্ষন লাগেনি প্লেন থেকে বের হতে। সে যাকগে, শেষে নামলাম। যেহেতু আমাদের আবার ফ্লাইট সেখান থেকে আমস্টারডাম এর জন্য, একই এয়ারলাইন্স, ইতিহাদ, তাই বাইরে বের হবার কোন দরকারও ছিলোনা আর ইচ্ছাও ছিলোনা। এয়ারপোর্ট তো নয় যেন স্বপ্নরাজ্য। ডিউটি ফ্রি শপে ভর্তি। চারিদিকে সুন্দরীরা ও রয়াল শেখ রা চিরাচরিত ও আধুনিক দুই রকম পোশাকেই ঘুরে বেড়াচ্ছিল। 
 প্লেনে কিন্তু আকাশসুন্দরীরা দারুন যত্ন করেছিল। বেশ নিজেকে রয়াল রয়াল লাগছিলো। 
তারপর বাঙালি বলে কথা , ফ্রেশ হতে হবে তো বাঙালি স্টাইলে। একে একে দুজনেই ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসে ভাবলাম চাড্ডি মুখে কিছু দেওয়া যাক। আমার হাইকমান্ড আবার চায়ের ভক্তিনি, আর আমি কালো কড়া কফির। চা কফির সাথে কিছু হালকা খাবারের দাম দেখে যা বুঝলাম তা আর কহতব্য নয়। বাঙালি পিলে প্যালারামের মত চমকে যাবে। আমি সামলাবার চেষ্টা করলাম, আগে থেকে অর্জিত জ্ঞান কে মনে করে। সাথে কিছু ইউ এস ডলার, কিছু ইউরো আর ফরেক্স প্রিপেড কার্ড ছিল। প্রেমসে অর্ডার দিয়ে স্মার্টলি কার্ড পেমেন্ট করে গিন্নির চোখে হিরো হবার বাসনা থেকে মুক্ত হতে পারলাম না। তাই কেস খেয়েই গেলাম আর আমার কার্ডের তাপমাত্রা বেশ কিছুটা কমে গেল। দেশের বাইরে প্রথম ফরেক্স কার্ড পেমেন্ট করে নিজেকে বেশ শেখ শেখ লাগছিলো। অবাক হয়ে এয়ারপোর্ট দেখছিলাম আর ভাবছিলাম যে ধু ধু মাঠের মধ্যে এতবড় কর্মকান্ড এরা কি সুন্দর ভাবে করে এত আধুনিক একটা এয়ারপোর্ট তৈরি করেছে।
পৌঁছেছি সকাল 6 টায় আর পরের ফ্লাইট সকাল সাড়ে নয়টায়। সোজা আবুধাবি থেকে আমস্টারডাম। সাত ঘন্টার উপর লাগাতার জার্নি। মজার কথা এই যাত্রাতেও কিন্তু 2 ঘন্টা উপরি পরমায়ু লাভ করলাম। কারণ UAE থেকে ইউরোপের সময় দুই ঘন্টা পিছিয়ে। অবশেষে আকাশসুন্দরী দের আদর যত্ন নিতে নিতে রেড wine এর সাথে জম্পেশ করে লাঞ্চ করে সাত ঘন্টার উপর সময় কাটাবার ফন্দি বের করলাম, মোবাইলে বই পড়া। কিন্তু তার কি আর জো আছে? পাশের জনকে এটা সেটার উত্তর দিতে আমি বাধ্য, তাই দিচ্ছিলাম। রাগবার তো উপায় ছিলোনা, তাই চোখ বন্ধ করে নিদসুন্দরী কে আবাহন করতে করতেই দেখি একটা মাথা আমার কাঁধে আর প্রশ্নের তোড় থেমে গেছে। বুঝলাম ভরা পেটে বাঙালিয়ানা মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে সিয়েস্তার জন্য। আমার অবশ্য বেশ ভালোই লাগছিলো। সেই কবেকার বিস্মৃতপ্রায় স্মৃতি ফিরে আসছিল মনের মধ্যে।
এবার একটা জরুরি কথা। ডিরেক্ট ফ্লাইট ইউরোপের জন্য আমাদের দেশ থেকে অনেক আছে, কিন্তু ভেঙে ভেঙে গেলে খরচ অনেক ই কম পড়ে। তাই লেওভার এর সময়টুকু ধর্তব্যের মধ্যে না নিলে ভেঙে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। অনেক টাকা বাঁচবে। সেটা দিয়ে মার্কেটিং বা আরো কয়েকদিন বেশি ঘোরা যায়।
আমস্টারডাম। সুন্দর সব ল্যান্ডস্কেপ উপর থেকে দেখতে দেখতে বিশাল প্লেন যার এক রো তে দশ জন করে বসে, মাটি ছুঁলো নিরাপদে। নেমে পড়লাম। লাগেজ মুম্বাইতে বুক করেছিলাম আমস্টারডাম এ নেব বলে। কিন্তু আগে তো ইমিগ্রেশন এর ছাপ্পা নিতে হবে পাসপোর্টে। দিলাম লাইন । কত দেশের নাগরিক একসাথে পাসপোর্ট কন্ট্রোল অফিসের লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কত সব ভাষায় কলকলানি শুনতে পাচ্ছি। এক বিচিত্র অভিজ্ঞতা। নিজেরাও সেই ভিড়ের একটা অংশ হয়ে ধীরে ধীরে এগোতে থাকলাম বিদেশি অফিসারের কাউন্টারের দিকে।
আমাদের প্ল্যান অনুযায়ী ট্যুর ম্যানেজার ইমিগ্রেশন কাউন্টারের বাইরে প্ল্যাকার্ড নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকবে। তাই একদিক থেকে নিশ্চিন্ত ছিলাম আর চোখ দিয়ে দলের লোকদের খুঁজছিলাম । পেয়েও গেলাম ,পরিচয় ও হলো।
তারপর বিদেশি অফিসার আমাদের রুটিন প্রশ্ন করেই খুব তাড়াতাড়ি ছেড়ে দিলো, জানিনা হল্যান্ডেও অশোকস্তম্ভের কোনো মাহাত্ম্য আছে কিনা যে অভিজ্ঞতা আমার ব্যাংককে হয়েছিল। ইন্ডিয়ান পাসপোর্ট দেখে জামাই আদর পেয়েছিলাম সেখানে। 
ব্যাগ কালেক্ট করার সময় দেখি আমাদের বেল্ট থেকে সব ব্যাগ নীচে নামিয়ে দিয়েছে আর অন্য একটা ফ্লাইট এর ব্যাগ রা দল বেঁধে ঘুরে চলেছে। কারণ আমাদের ইমিগ্রেশন এ অনেক সময় লেগেছিল , লোক ও অনেক ছিল। আমার সুটকেস আমার জন্য অপেক্ষা করছিল খপ করে হ্যান্ডেল ধরে নেওয়াতে ধড়ে প্রাণ এলো। এ মা, একি কান্ড!  তেনার টা কই? শেষে যারা বেল্টে ঘুরেই চলছিল তাদের মধ্যে থেকে উদ্ধার করলাম তেনার সুটকেস কে, বেচারি হংস মধ্যে বক যথা হয়ে অন্যদলের সুটকেশদের সাথে ঘুরেই চলছিল। 
বাইরে বেরিয়ে পেলাম ট্যুর ম্যানেজার কে অনেক লোক কে পাশে নিয়ে। অনেকে আমাদের ফ্লাইট এই এলো অনেকে একটু আগে পরে। সবাইকে নিয়ে রোলকল এর মত নাম ধরে ডেকে ট্যুর ম্যানেজার, যে নাকি আবার ঘটনা চক্রে বোমান ইরানির কাজিন ভাই, কয়েকটা হিন্দি ফিল্মেও অভিনয় করেছেন ক্যারেক্টার রোল এ, নাম আসপি স্যাম ইরানি, নিয়ে চললেন আমাদের কে হোটেলে একটা দারুন বাস চড়িয়ে। খবর নিলাম বাসটার, INR এ দাম পৌনে দু কোটি মাত্র। ডিসক্লেইমার: কারও মাথা ঘুরলে আমি দায়ী নই।
বাস তো নয়, ছোটখাটো প্লেন একটা। কি নেই তার মধ্যে। 
সবকিছু করে এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে আমাদের সূর্যের আলো থাকতে থাকতেই ডিনার করিয়ে দিলেন কারণ ওখানে সন্ধে হয় রাত পৌনে দশটায়। বেশ মজাই লাগছিলো দিনের বেলা ডিনার করতে। সবাই ক্লান্ত ছিল তবে ইন্ডিয়ান রেস্তোরাঁ হবার জন্য দেশি খাবার পেয়ে যারপরনাই খুশি ছিলাম আমরা সবাই। তারপরে হোটেল, খুব সুন্দর হোটেল তেমনি সুন্দর ঘর। তিন রাত থাকবো ওখানে। বাথরুমে গিয়ে ফ্রেশ হতে গিয়ে রাম ফ্যাসাদে পড়লাম। ব্যাটারা শুধু কাগজ ব্যবহার করে আর আমাদের জল মাস্ট। এমনকি পাশের কলটাও নেই। কি করি ? লাগালাম বাঙালি বুদ্ধি।
তথ্য চুপিচুপি: যারা যাবেন ওই সব দেশে অবশ্যই একটা ছোট মগ বা খালি বোতল বা ঐরকম কিছু নিয়ে যেতে ভুলবেন না, অবশ্য যদি কাগজেই অভ্যস্ত আমার কিছু বলার নেই।
সুটকেস খুলে বড় সাইজের প্লাস্টিক গ্লাস যেটা নাকি তিনি নিয়েছিলেন ইলেক্ট্রিক কেটলির সাথে, চা খাবে বলে, উৎসর্গ করলাম যথাবিহিত সাংসারিক পুজোর মন্ত্রের সাথে ওই কাজের জন্য। তারপর আঃ কি আরাম। গ্লাস টা আমাকে শেষ দিন অবধি সার্ভিস দিয়ে গেছে কাগজের সাথে পাল্লা দিয়ে। বেঁচে থাকো সোনা, দেহত্যাগ কোরোনা। একটা গ্লাস  সেও প্লাস্টিকের যে এত উপকার দেবে স্বপ্নেও ভাবিনি। গোপাল ভাঁড়ের গল্প মনে পড়ে গেলো। সিরাজদৌল্লার মত আয়েশি হয়ে দেড় ফুটিয়া গদির উপরে বডি ফেলে শয়নে পদ্মনাভনচ বলে প্রথম বিদেশে রাত কাটাবার জন্য ঘরের আলো বন্ধ করে দিলাম।
আজ এই পর্যন্ত। আবার আসছি, কালকে ব্রেকফাস্ট করতে হবে তো। রাত টা কাটুক।



সমস্ত ছবি লেখকের নিজের তোলা


                                                                                                       ক্রমশঃ





Thursday, May 31, 2018

আবৃত্তি--দেবশ্রী চক্রবর্তী



নৈঃ শাব্দিক


স্বরচিত কবিতা আবৃত্তি ঃ দেবশ্রী চক্রবর্তী










গল্প-শম্পা সান্যাল



বরিষ ধরা-মাঝে শান্তির বারি


Image Courtesy: Google Images

 



একরাশ বিরক্তি সহকারে রনি শুয়ে শুয়ে আকাশ পাতাল চিন্তায় ডুবে ছিল। আজ দুপুর বিকেল দুটোই মাটি। মা হঠাৎ করে বেলুড় দর্শনে বেড়িয়ে গেল, এখন না ফেরা পর্যন্ত থাকো বসে। বাবার তো ফিরতে ফিরতে আটটা-ন'টা। টি.ভি., ল‍্যাপটপ নিয়ে খানিকক্ষণ কাটিয়ে একটা টেনে ঘুম দেবে বলে এসে শুয়েছে সবে, ডোরবেলের আওয়াজ। রুপমদের বলেছিল আসতে, হবে না বলেছিল ওরাই কেউ নাকি দুপুরের সেলসম‍্যান, ভাবতে ভাবতে দরজা খুলতেই দেখে  আকর্ণ বিস্তৃত হাসি নিয়ে বর্ষা, ওর ছেলেবেলার বন্ধু দাঁড়িয়ে। ___আপদ, তুই এখন কেন রে, জ্বালানোর আর সময় পেলি না?
___তালাটা খুলবি কিনা! গরমে মরছি, খোল্
___তা, তোকে মরতে আসার জন্য কে ডেকেছে।
___মনে হলো, চলে এলাম। কাকীমা ক‌ই, শুয়ে?
___না, বাড়ি নেই, আমি একা আছি, তুই ফোট্।
___তবে! ভয় পাচ্ছিলি তো! দ‍্যাখ্, এইজন্যই বলি আমার নাম বর্ষা না ভরসা। দ‍্যাখ্ কেমন সময়মতো এসে গেছি বলে হ‍্যা হ‍্যা করে হাসতে থাকে।
___ভরসা! তোকে! যে করবে তার দীর্ঘায়ু কামনা করি। টেনে একটা ঘুম দেবো ভাবছিলাম, আসলেন জ্বালাতে! 
___তো, ঘুমাও না। আমার এখন বাড়িতে যাওয়া চলবে না।
___আর কারো কথা মনে এলো না, চিরকালের আপদ। এই কি বললি! বাড়িতে যেতে পারবি না, কেন, আবার কি ক‍্যাচাল বাঁধিয়েছিস?
___না গুরু, আমি না___
___অবশ‍্য এ আর নতুন কি! হাসতে হাসতে বলে রনি।
___আরে, মহাজ্বালা! আমি না,মা একটা কান্ড করেছে, বাপীও আছে সাথে।
___ কাকীমা! যত কান্ড তো আপনার অবদানেই ঘটে।
___শুনবি, না চেপে যাবো?
___না, না বল্ 
___কথা নেই, বার্তা নেই হঠাৎ দেখি ছোটমাসী হাজির। তারপর দেখি দুই বোনে আমাকে  কি পড়লে মানাবে, চুলটা ছাড়া থাকবে না বাঁধা হবে এইসব আলোচনা করছে। কেসটা কি বোঝার চেষ্টা করলাম, তাতে আমাকে জানানো হলো দুপুরের পর বাপীর কোন বন্ধু পত্নী সহ আসছেন অত‌এব আমি যেন বাড়ি থাকি। আমার থাকার সাথে কি সম্পর্ক, না ভালো দেখায় সবাই থাকলে এই আর কি! বুঝলাম, খাওয়ার পর মা-মাসীর উপদেশ মনে করে কেটে পড়লাম।
___মানে! না বলে চলে এসেছিস?
___আতাক‍্যালা, বললে আসতে দিতো!!
___তো আমাকে জ্বালাতে না এসে বাড়ি থাকলে কি এমন হতো!
__আরে বুঝতে পারছিস না, পাত্রপক্ষ টক্ষ হবে, আর আমাকে সং সেজে ওদের সামনে বসতে হবে, ভাবা যায়!
___সবাই বসে আর তোর তো আলাদা করে সং সাজার দরকার‌ই নেই, আগমার্কা সং একটা!
__আআআ,
__বলবি, আর
___কি নোখ রে, লেগেছে কিন্তু।
___আমি সং তো তুই কি, তুই তো একটা ভূত।
__ভূত তো ভূত, শেষে তো ভূতের কাছেই আশ্রয় নিয়েছিস, অকৃতজ্ঞ কোথাকার। তবে তোর সাথে যার সম্বন্ধ হবে___বলে রনি হাসতে থাকে।
___আরে, বর্তে যাবে রে!
___আমি অবশ‍্য তোর বিয়েতে যাবো না, একটা ছেলে হয়ে আর একটি ছেলের দুঃখ দেখতে পারবো না।
___বয়ে গেছে, তোর অপেক্ষায় আটকে থাকবে নাকি, আচ্ছা আপনার লেটেস্ট নিউজ কি!
___আমার কথা ছাড়্, তুই না পাগলের ডাক্তারকে বিয়ে করিস।
___দে না জোগাড় করে।
____দেবো, সাথে আর কটা ডাক্তারের ঠিকানাও, দুদিন পর বেচারা ওকে তো যেতে হবে!
ঢাই করে একটা কুশান এসে পড়ে রনির গায়ে, হাসতে হাসতে দ্বিতীয়টা আটকাতে আটকাতে বলে___কাকীমা পুরো চেপে গেছিলেন? মালদার পার্টি হতে পারে, কেটে পড়লি কেন?
___বয়ে গেছে এখন আমার এখন বিয়ে করতে।
___করিস না, রান্নাঘরে গিয়ে দুকাপ চা করে নিয়ে আয়।
___পারলাম না।
___তা'লে বেরো।
___কাকীমা আসলে যাবো। তোকে একা রেখে, আমার একটা দায়িত্ব আছে না___
___দাঁড়া, কাকীমাকে ফোন করে বলছি যে...
___এই, একদম না, একদম না। মেরে ফেলবো যদি বলিস।
___তাহলে চা কর্।
___তোর এখন চা খাওয়ার কি দরকার
এমন সময় আবারো ডোরবেলের আওয়াজ শুনে রনি বলে মনে হয় আজকে পিসি আগে এসেছে, যা তোকে চা করতে হবে না, দরজা খুলে দিয়ে আয়।কটমট করে তাকিয়ে বর্ষা দরজা খুলতেই দেখে অপরিচিত দুজন দাঁড়িয়ে। ওরাও বিস্মিত। বর্ষা রনিকে ডাকতে রনি এসে দেখে পিসিমনি পিশেমশাই।
___আরে! তোমরা! এসো এসো।
___ভিতরে এসে পিসিমনি একটু বিরক্ত সহকারে মায়ের খোঁজ করে।
___মা কি জানতো! আমাকে তো তোমাদের কথা বলে যায়নি।
___আমরাই কি জানতাম!
__মানে!
___মেয়েটা কে?
___ও বর্ষা, আমার ছোটবেলার বন্ধু।
__তোর মা বাবার তো আসার দেরী আছে তাহলে।
ইতিমধ্যে দেখে ট্রে করে দুগ্লাস জল নিয়ে এসেছে বর্ষা,হাসি চেপে রাখে রনি।
___কাছেই থাকো?
__হ‍্যা কাছেই বলতে পারেন। চা খাবেন তো আপনারা?
___দাঁড়া, পিসি এসে যাবে এখুনি বলতে বলতে রনি হাসে, বর্ষা অগ্নিদৃষ্টি নিক্ষেপ করে বলে আমি এবার যাই, ঠিক আছে।
___যাবি? যা__ পিসিমনি মাকে ফোন করে বলছি
___না,না আজ আর দেরি করবো না, মাকে ব‍্যস্ত করিস না।
বর্ষা যাওয়ার সময় প্রণাম করতে গেলে থাক্ থাক্, ঠিক আছে- র মাঝে নয় হয়। দরজা অবধি এসে রনি বলে__ বাবা, গুণ তাহলে কিছু আছে, ওকে সাবধানে যা, পরে কথা হবে।
___টাটা
ফিরে এসে বলে__মা আমার উপরে রাগ করবে, দেখো।
___আচ্ছা সে আমি বুঝিয়ে বলবো। আসলে এদিকে একটা কাজে এসেছিলাম, হলো না, তাই একবার ঘুরে গেলাম।
___তোর ঐ বন্ধু প্রায়ই আসে নাকি!
___না, না আসে তবে আমাদের পড়াশোনা তো আলাদা হয়ে গেছে, আসে সময় পেলে। মায়ের সাথে খুব ভাব, মা বলেন ওর মধ্যে একটা সরলতা আছে। মনটা সত‍্যি ভালো।
__মা ছাড়্ তোর কি মত?
___আ আমার! ধুরর্। বন্ধু! আরে আজকে কেন এসেছে জানো, কারা নাকি ওকে দেখতে আসবে তাই পালিয়ে এসে বকবক করে জ্বালিয়ে গেল, বোঝো কারবার।
পিসি, পিসেমশাই তড়াক করে লাফিয়ে ওঠেন।
___মানে! ওদের ঠিকানাটা বল্ তো।
___পোস্টাল এ‍্যাড্রেস বলতেই পারবো না। আমাদের থেকে তিন-চারটে স্টপেজ পরে, বড় রাস্তার উপরেই বাড়ি।
___ওর বাবা কি করেন, নাম কি জানিস?
___ব‍্যাঙ্কে যতদূর জানি কিন্তু কেন? তোমাদের পছন্দ  হয়ে গেল নাকি!
___ওর একটা ভাই আছে?
___হ‍্যাঁ, তবে দাঁড়াও দাঁড়াও, তোমরা কি ওদের বাড়িতে গেছিলে?
___ওদের বাড়ি কিনা জানিনা তবে সব শুনে তো তাই মনে হচ্ছে। বান্টির জন্য একজন বলেছিলেন, ভাবলাম আগে বাড়িঘর, মেয়ে দেখে তারপর সবার সাথে কথা বলবো। সেইমতো এসে, ওমা! একথা একথা বলে, মেয়ে দেখায় না। শেষে বলছে বিশেষ কাজে মেয়ে বেড়িয়ে গেছে, যদি আর একদিন কষ্ট করে আসেন। 
রনি হাসতে হাসতে সোফায় হেলান দিয়ে বসে বলে__বেঁচে গেছো।
___কেন রে!
___দ‍্যাখো, এমনিতে অপছন্দের কারণ নেই কিন্তু তোমাদের সকলকে পাগল করে দিতো আর আমি তো ভাবতেই পারছি না, দাদাভাই- এর বৌ বর্ষা! ও.এম. জি.


                                 পিসিমনিরা চা-টা খেয়ে চলে গেলেন। রনি একা একাই হাসছে, বাবা মা এলে হাসতে হাসতে বলে বর্ষার কীর্তি। দুজনেই বিরক্ত হন, তবে বাবা বলেন আজকালকার যুগে ছেলেমেয়েদের সাথে কথা বলে নেওয়া উচিৎ ছিল, জোর করে বিয়ে দেওয়া ঠিক নয়। এসবের সাথে খাওয়া দাওয়া সাঙ্গ করে ফোন করে বর্ষাকে। সুইচ অফ! কয়েকবার চেষ্টা করেও বর্ষার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারলো না। ফেসবুকে অনলাইন দেখে দেবীকে।
__কি ব‍্যাপার! মোবাইল কেড়ে নিয়েছে মনে হচ্ছে।
___বয়েই গেছে। এই খুব খিদে পেয়েছে রে!
___কেন, রাতে খেতে দেয়নি?
___ রাগ দেখিয়ে খাইনি। এখন হেভি খিদে পাচ্ছে।
___জল খা। একটা রাত উপোস করলে কেউ মরে না।
____জ্ঞান দিতে হবে না। আমি একটু পরেই খাবো। না খেলে আমার ঘুম আসে না।
___খেলি না কেন তাহলে?
____আরে, এন্তার বকে যাচ্ছে, আমার সমস্যার কথা বলছি, শুনছেই না।
___সারা দুপুর কোথায় ছিলি বলেছিস?
____পাগল! তাহলে তোকেও ছাড়তো নাকি! চেনো নাতো আমার বাবা-মাকে!
___ওকে, যা খেয়ে নে। পরে কথা হবে।
___টাটা।
দাদাভাই ফোন করছে এই সময়!
___হ‍্যালো 
___কিরে, শুয়ে পড়েছিস নাকি!
___না, না বলো।
____মেয়েটার সাথে আলাপ করা।
____কোন্ মেয়েটা!
____আরে, আজকে মা বাবা যাকে দেখেছে 
____কেন! ওর সাথে আলাপ করে কি করবে?
___সে তোর জানার দরকার নেই।
___বাঃ, এটা কোনো কথা হলো?
____আমি তোর দাদা বলছি,তাই হয়েছে?
___ মানে, তুমি কি ওকে অপমান করার জন্য বলছো?
___ তোর অসুবিধা কোথায় বল্ তো!
___ঠিক আছে, দেখছি। রাখলাম।
 না, রনি আলাপ করায় নি। পিসিমনিরা কাগজে বিজ্ঞাপন দিয়ে দাদাভাই-এর বিয়ে দিয়েছে। গল্পটা শেষ হয়েও হলো না। রনি কর্মসূত্রে এখন প্রবাসী। বর্ষার সাথেও যোগাযোগ ক্ষীণ। এখন রনির বিয়ে নিয়ে বাড়িতে কথা চলছে। বন্ধু বান্ধব সব ছড়িয়ে গেছে। এর‌ই মাঝে একবার দিন কয়েকের জন্য এসেছে, কিছু বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ হয়েছে, ঠিক হয়েছে একদিন সবাই মিলে কাটাবে। বর্ষার বাড়ি রনির কাছে, সুতরাং ওর ওপরে দায়িত্ব পড়লো বর্ষাকে ডাকার। ইদানিং দাদাভাই বৌদির মধ‍্যে নাকি ঝামেলা, স্বেচ্ছায় দাদাভাই বদলি নিয়েছে। মা মারফত খবর মেলে। কোথায় যে গন্ডোগোল, কে জানে!বর্ষার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছে বলেই বোধহয় দাদাভাই এর কথা মনে এলো। বর্ষাদের বাড়ি অনেক দিন পরে এলো, খানিকটা পাল্টে গেছে। কলিংবেলের আওয়াজে যিনি দরজা খুললেন রনি চিনতে পারলো না। ক্রমে জানালো ওরা বাড়ি বিক্রি করে চলে গেছে। কোথায়! একরাশ মন খারাপ নিয়ে বাড়ি এসে মাকে বললো। খোঁজ নিয়ে জানতে পারলো বর্ষা কারো দ্বারা প্রতারিত হয়ে আত্মহত্যা করতে গেছিল। বন্ধুরা শুনে বললো ওর এটাই স্বাভাবিক, কখন যে কার সাথে মিশছে। এত প্রাণবন্ত মেয়েটা হারিয়ে গেল!

                বর্ষা একটা এন.জিওতে কাজের সূত্রে দিব‍্যেন্দুর সাথে পরিচয় হয়, ক্রমে দুজনে একসাথে থাকতে শুরু করে কিন্তু দিব‍্যেন্দু যে বিবাহিত জানতে পারে ওর স্ত্রী সব জেনে ফেলার পর। বর্ষার মা বাবা দিব‍্যেন্দুদের বাড়ি গেলে ওর বাবা মা চিনতে পারেন, অপমান করতেও ছাড়েন না। দিব‍্যেন্দু নিছক মজা উপভোগ করছিল, অবস্থা বেগতিক দেখে বদলি নিয়ে কেটে পড়েছে। বিধ্বস্ত পরিবারটি পরিচিত পাড়া ত‍্যাগ করে যায়।দাদা বৌদির সম্পর্ক উন্নতির খবর মেলে, মেলে না বর্ষার খবর। অসময়ে ডোরবেল বাজলে আজো রনির বর্ষার আকর্ণ বিস্তৃত মুখখানি চোখে ভাসে। ও কি বর্ষাকে বোঝেনি, বোঝেনি নিজের মনকেও! বর্ষা হারিয়ে যায় আবারও। নতুনকে কেন্দ্র করে রনির দিন‌ও কাটে।

                        টি.ভি. তে একটি অনুষ্ঠান চলছে, স্বামী স্ত্রী, বন্ধু বান্ধবীর সম্পর্ক বিষয়ে, রনি বিস্ময়ে হতবাক, দেখে বর্ষা সঞ্চালক হয়ে ভরসা জুগিয়ে যাচ্ছে কয়েক জোড়া নারী পুরুষকে। কানে বাজছে বর্ষার কথা : মূলমন্ত্র‌ই বিশ্বাস, ভরসা। একে অপরকে ভরসা না করলে সম্পর্ক দৃঢ় হয়না, কোনো সম্পর্কই না।

Main Menu Bar



অলীকপাতার শারদ সংখ্যা ১৪২৯ প্রকাশিত, পড়তে ক্লিক করুন "Current Issue" ট্যাব টিতে , সবাইকে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা

Signature Video



অলীকপাতার সংখ্যা পড়ার জন্য ক্লিক করুন 'Current Issue' Tab এ, পুরাতন সংখ্যা পড়ার জন্য 'লাইব্রেরী' ট্যাব ক্লিক করুন। লেখা পাঠান aleekpata@gmail.com এই ঠিকানায়, অকারণেও প্রশ্ন করতে পারেন responsealeekpata@gmail.com এই ঠিকানায় অথবা আমাদের ফেসবুক গ্রুপে।

অলীক পাতায় লেখা পাঠান